তপ্ত রোদ, বাবা ক্ষেত থেকে বোঝা কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফিরেন। বোঝা বয়ে আনতে তিনি হাঁপিয়ে উঠেন। উঠানের কাছাকাছি বাবার ডাক শুনলেই মা ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসে বোঝাটি নামিয়ে নেন। পানির কলটি কিছুক্ষণ চেপে, ওপরের পানি ফেলে দিয়ে এক জগ ঠাণ্ডা পানি বাবার হাতে তুলে দিতে দিতে মা আক্ষেপ করেন,—‘আহা, মানুষটা আর কত পারে? একজনের আয়ের সংসার, কত কঠিন। ছেলেগুলো বড় হলে তোমার কষ্ট আর থাকবে না।’ বাবার মনে অবশ্য কোনো দুঃখ দেখি না, হাসিমুখে কাজ করে যান। সম্ভবত, তিনি মেনে নিয়েছেন যে এভাবেই চলতে হবে—এটাই জীবন। আমরা পাঁচ ভাই-দুই বোনের বিশাল সংসার একা পরিশ্রমে টেনে চলেছেন তিনি।
বাবা ক্ষেত থেকে ফিরলেই মায়ের আক্ষেপ শুনি—একটা মানুষ আর কত পারে! ছেলেগুলো বড় হোক, তোমার কষ্ট আর থাকবে না।’ আমার স্কুলজীবন পর্যন্ত বাবার সংসারটি যে টানাটানির এতটুকুই বুঝতাম, কলেজে উঠে মায়ের আক্ষেপের অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারছিলাম। মা চাইছিলেন, আমরা ছেলেরা বড় হয়ে যাই, বাবার কাজের হাল ধরি, বাবাকে নিত্যদিনের পরিশ্রম থেকে মুক্তি দিই। একদিন কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে আমারও মনে হতে থাকলো—বাবা, একটা মানুষ প্রতিদিনই হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন, তিনি আর কতই বা পারেন! আমি কলেজে পড়ি মানে আমি তো বড় হয়ে গেছি, বাবার ‘বড় ছেলে’ হিসেবে আমারই তো কিছু করা উচিত। মাকে গিয়ে বললাম, আমি বাবার পরিশ্রমের হাল ধরতে চাই। বাবার সামান্য যে জমিটুকু আছে, বেচে দিয়ে আমাকে বিদেশে পাঠাতে বলুন। মা আমার কথায় অন্যরকম খুশিতে মেতে উঠলেন, সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে কথাটুকু বললেন। বাবাও রাজি হয়ে গেলেন। জমিটা বিক্রি করে, ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে তিনি সংসারের ঘানি টানা থেকে কিছুটা হলেও রেহাই চান।
অল্প কিছুদের মধ্যেই আমাদের জমিটি বিক্রি করে দিলেন বাবা। সেই টাকা দিয়ে মায়ের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে আমিরাতের ভিসাও যোগাড় করে ফেললাম। ছোট ভাই-বোনদের খুব মন খারাপ হলো। বোনটির বড় সাধ ছিল, আমি পড়ালেখা করে কলেজের অধ্যাপক হবো—তাই সে কান্নাজুড়ে দিল। আমি তাদের বুঝালাম—আমি তোদের সবার বড়, পরিবারের বড় ছেলে, বাবার একার আয়ে সংসার চলছে না। আমি টাকা পাঠাবো, তোমরা পড়ালেখা করবে, সুন্দরভাবে-স্বচ্ছলভাবে চলবে। মায়ের অনুভ‚তিটা ঠিক আঁচ করা গেল না, তিনি দুই ধরনের কথা বলছেন। মা, সম্ভবত দোটানায় পড়েছেন—আমার জন্য মায়া লাগছে আবার সংসারের অভাব দূর করতে এটা ছাড়া যে উপায় নেই সেটাও ভাবছেন। তিনি একবার বলছেন—আহা, আমার বড় ছেলেটাকে দূরে পাঠিয়ে কিভাবে থাকবো? আবার বলছেন, ছেলে দুবাই থেকে অনেক টাকা কামাই করবে—আমরা বড় লোক হয়ে যাব।
আমার চোখে অনেক স্বপ্ন জ্বলজ্বল করছে। আমিরাত গিয়ে টাকা কামাই করবো, দেশে পাঠাবো। বাবাকে আর এমন খাটুনি করতে হবে না প্রতিদিন, ছোট ভাই-বোনদের পড়ালেখাটা বন্ধ হবে না, বোন দুটিকে বিয়ে দিতে হবে…সুন্দর একটি বাড়ি করবো, আরও কত কি। মাকে আর আক্ষেপ করতে হবে না বাবার জন্য। সবার সুখের কথা চিন্তা করে, পড়ালেখার পাঠচুকিয়ে বিদেশে পাড়ি জমালাম।
গ্রামের সহজ-সরল জীবনে অভ্যস্ত সবে কৈশোর পেরোনো এই আমি দুবাই শহরের আলোর ঝলকানিতে বিমোহিত থাকি কয়েকদিন। এখানে জীবন যেন এক অন্যরকম বিলাসিতা, কারও হাতে সময় নেই, সবাই শুধু ছুটছে আর ছুটছে। ভিসা দেওয়ার আগে যে স্বজনরা ফোনে বলেছিল, দুবাই আসলেই সব ব্যবস্থা করে দেবে—তাদেরই কী কদর্য চেহারা দেখছি তা ভেবে ক‚ল পাচ্ছি না। ফোনে যা বলছি তার কিছুই ঠিক নয়, তাদের আচরণ ঠিক উল্টো, আমার জন্য কারও বিন্দুমাত্র সময় নেই, মায়া নেই। একটি বহুতল ভবনের এক ফ্ল্যাটের মেসে কোনো প্রকার থাকার বন্দোবস্ত হলো। ফ্ল্যাট শব্দটি শুনলেই আমরা যেমন একটা অভিজাত ভাব অনুভব করতাম, এখানকার ব্যাপারটি মোটেই তা নয়। ফ্ল্যাট বটে, একেক রুমে কমপক্ষে ত্রিশ-চল্লিশজন মানুষ উপর-নিচে অদ্ভুত ধরনের খাট বানিয়ে ঘুমানোর ব্যবস্থা, তা দেখে আমার গ্রামের মুরগির খোপগুলোর মতো লাগে। কিছুদিনের মধ্যে অনেকের একটু-আধটু বদান্যতায় একটি কাজও যোগাড় করা গেল। তারপর কাজে নেমে পড়লাম পুরোদমে। কাজে নেমেই বুঝলাম—এই শহর যতটা রঙিন, আমার চোখের স্বপ্ন যতটা রঙিন ছিল বাস্তবে প্রবাসজীবন বিন্দুমাত্রও রঙিন নয়। খুব ভোরে, ফজরের আজানের সাথে সাথে ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতে হয়, সারাদিন বিরামহীন খেটে চলা, বিশ্রাম বলে কোনো শব্দ নেই। আমার বাবা ক্ষেতে কাজ করে দুপুরে তপ্তরোদে বাড়ি ফিরতেন। তারপর দক্ষিণের খোলা বারান্দায় একটি পাটি বিছিয়ে গভীর ঘুম দিতেন। এখানে আমার কাজের সময়ের হিসেব নেই। সকালে যথাসময়ে পৌঁছাতে হবে সেটা বাধ্যতামূলক তবে কাজ কবে শেষ হবে তার হিসাব নেই। দিনে বার-চৌদ্দ ঘণ্টার পরিশ্রম শেষে বাসায় ফিরে রান্না করে খাওয়া, কাপড়-চোপড় ধোয়া থেকে সব কাজ নিজেকেই করতে হয়। বাড়িতে যে কাজে কোনোদিন হাতও দিইনি, সেসব এখন রুটিন কাজ। দিন নেই, রাত নেই, অসুখ-বিসুখের তোয়াক্কা নেই—গাধার খাটুনিতে মাস শেষে যে টাকা পাই তার একটি বড় অংশ বাসা ভাড়া আর খাবার বিল দিতে হয়, বাকি টাকা মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিই। নিজের সাধ-আহ্লাদের জন্য অল্প টাকা জমিয়ে রাখব কি-না ভাবি, পরক্ষণেই মনে হয় দরকার কী? টাকা কম গেলে বাবার তো কষ্ট হবে। কঠোর পরিশ্রম করি, নিজের জন্য মাস শেষে কিছুই থাকে না, নিজে একটা ভালো কাপড় কিনতে পারি না, তবুও মায়ের মুখ থেকে যখন শুনি তারা সবাই ভালো আছে তখন মনটা ভালো হয়ে যায়। মনের কষ্ট আড়াল করে হাসিমুখে বলি, ‘আমি ভালো আছি, মা।’

প্রবাসে দিন যতই বাড়ছে—দেশের সবার জন্য, সবকিছুর জন্য মন পুড়ছে। গ্রামের নির্মল প্রকৃতি-পরিবেশে মিশে কাটানো মায়াভরা শৈশব, স্কুল-কলেজের বন্ধুবান্ধব, গ্রামের সাঁতার কাটা পুকুরটি, ঘরের পেছনে বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত, ধানের আইল দিয়ে হাঁটা, ধান উঠে গেলে ফুটবল খেলায় মেতে উঠা, নদীর চরে বাদাম চাষ, ঘরের গাছে উঠে আম-জাম পেড়ে খাওয়ার স্মৃতি ক্ষণে ক্ষণে মনের মাঝে উদয় হয়। ইচ্ছে করে এখনই ছুটে যাই আমার শৈশবের বালুকাবেলায়। মায়ের মুখটি মানসপট থেকে সরাতেই পারি না আর যখন কাজ করতে গিয়ে ঘর্মাক্ত শরীরের ফিরি তখন বাবার সেই দৃশ্যটি চোখে ভেসে উঠে।
এভাবেই কাটতে লাগলো প্রবাস জীবন। আমি টাকা পাঠাই, ভাইয়েরা পড়ালেখা করছে, বাবা পরিশ্রমের কাজ থেকে মুক্তি পেয়েছে, মায়ের আক্ষেপ ঘুচেছে। অনেক কিছুই বদলে যাচ্ছে। মন কাঁদে কিন্তু দেশে যাওয়ার পথ খুঁজে পাই না। অসঙ্গতিতে আটকে আছে জীবন। আমি টাকা পাঠাই বলেই ভাইয়েরা পড়ছে, বোনগুলো বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে তাদের বিয়ে দিতে হবে, সে জন্য কিছু কিছু টাকা জমানোর চেষ্টা করি। এর মধ্যে ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় রিনিউ করতে টাকা লাগছে। ছোট ভাই বায়না ধরে তার একটি মোটরসাইকেল দরকার, আমি ঘামভেজা টাকা পাঠিয়ে তার শখ পূরণ করি—এভাবে নানা চাহিদা মেটাতে মেটাতে দেশে যাওয়ার সুযোগ আসে না।
সময়ের সাথে দেশের ফোনগুলোর ধরনও বদলে গেছে। মা ফোন করেন, মাঝে মাঝে বাবা ফোনে কথা বলেন। বেশিরভাগ ফোনই নানা ধরনের চাহিদার। আশপাশে কেউ একটি জমি বিক্রি করে দিচ্ছে জেনে ছোটভাই ফোন দিয়ে বলে ভাই জমিটা কিনে নেন। আমি টাকা পাঠাই, সে জমি কিনে নেয়। মা ফোন করে বলেন, তার এক মামাতো ভাই খুব অসুস্থ তাকে কিছু সাহায্য যেন করি, আমি তা-ই করি। বোন ফোন দিয়ে বলে, তার স্বামীর একটা সমস্যা হয়েছে তাকে যেন কিছু টাকা ধার দিই, আমি তা-ই করি। এসব কাজে বড়ই তৃপ্তি পাই। মা সবাইকে বলে বেড়ান—আমার বড় ছেলেটা না হলে আমাদের দুঃখ কোনোদিন যেত না।
এভাবেই কেটে গেল প্রায় বারটি বছর, এক যুগ। ক্ষণিকের জীবন থেকে এতগুলো বছর অনেক বড় সময়। তবুও কাজ শেষে কবুতরের খুপড়ির মতো খাটে ক্লান্ত দেহটা এলিয়ে দিয়ে যখন হিসেব করি—এই জীবনে কি করতে পেরেছি, তার যে ফলাফল দেখি তাতে নিজেকে বেশ সফল মনে হয়। বাবাকে খাটুনি থেকে মুক্তি দিয়েছি, ভাইদের পড়ালেখা করিয়েছি, বোনদের বিয়ে দিয়েছি আর কিছু জমিজমা কিনেছি।
বাবা-মা, ভাই-বোনদের জন্য বড্ড মায়া লাগচ্ছে, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছি না। দেশে এবার যাবই, যাব। তারপর, আরও অনেকদিন পর-একদিন দেশে ফিরলাম। এতদিনে অনেক কিছুই বদলে গেছে। চিরচেনা গ্রামটি অনেক অচেনা লাগছে, আমাদের পরিবারের আগেরকার পরিস্থিতি আর এখনকার চালচলনে বেশ তফাৎ। বাবা-মায়ের মধ্যে অভিজাত ভাব দেখে বেশ আনন্দই পেলাম। কিছুদিন গ্রামে কাটানোর পর মনে হতে থাকলো—বিদেশের গাধার খাটুনি থেকে আমারও মুক্তি দরকার। বাবার জন্য মায়ের করা সেই আক্ষেপের বাক্যটি এখন নিজেকেই বিদ্ধ করছে। ভাবলাম দেশেই একটা কিছু করি। কিন্তু কপাল যে আমার এতটা মন্দ ভাবতেই পারিনি। ভাইদের কাছে পাঠানো টাকা আর জমিজমার হিসাব নিতে গিয়ে দেখলাম, আমার কিছুই নেই! টাকাগুলো সব নানা খাতে খরচে গেছে, জমিগুলো কেনা হয়েছে ভাইদের নামে। এমন কেন জানতে চেয়ে উত্তর পেলাম, বাবার জমিটা বিক্রি করেই তো বিদেশে গিয়েছিলাম, সুতরাং জমি এখন অন্যরা পাবে!
মন খারাপেরও একটা সীমা থাকে, আমার সে সীমা অতিক্রম করল। নিজেকে সংযত রাখার জন্য এই ঘর ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। গভীর রাত, বাইরে গভীর অন্ধকার, আমি বেরিয়ে পড়লাম। অন্ধকার মাড়িয়ে হাঁটছি, আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে। ওদের মায়ায় আমি কতদূর থেকে চলে এলাম, ওদের ছেড়ে আমি কোথায় চললাম?
সি-তাজ২৪.কম/এস.টি