বাংলাদেশের খ্যাতনামা বিজ্ঞানী ‘খান বাহাদুর’ কাজি আজিজুল হক (১৮৭২-১৯৩৫) আধুনিক ফরেনসিক সায়েন্সের অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিত। তিনি ছিলেন অপরাধী শনাক্তকরণে আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবক, যা এখনকার ফরেনসিক বিশ্লেষণে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
কাজি আজিজুল হকের উদ্ভাবিত ‘হেনরি পদ্ধতি’ বা ‘হেনরি সিস্টেম’ এখন বিশ্বব্যাপী অপরাধীদের শনাক্তকরণের অন্যতম পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাজি আজিজুল হক যে কষ্টসাধ্য গবেষণা এবং উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনা করেছেন, তা তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা: কাজি আজিজুল হক ১৮৭২ সালে ব্রিটিশ ভারতের খুলনা জেলার ফুলতলা পয়োগ্রাম কসবায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন একজন শিক্ষক, এবং পরিবারে তার শিক্ষার প্রতি আগ্রহ শুরু হয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। কাজি আজিজুল হক কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিতের ছাত্র ছিলেন, এবং তাঁর ছাত্রজীবনে গণিতের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন, এবং তার কৃতিত্বের জন্য কলেজে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তকরণ/আঙ্গুলের ছাপ পদ্ধতির উদ্ভাবক বা আবিষ্কার: কাজি আজিজুল হক প্রথমে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে কাজ শুরু করেন ১৮৯২ সালে। তখন অপরাধীদের শনাক্তকরণের জন্য অ্যানথ্রোপমেট্রি (মানবদেহের আকৃতি) পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। তবে এই পদ্ধতির কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, বিশেষত অপরাধীকে শনাক্ত করতে সময় বেশি লাগত এবং এ ক্ষেত্রে অনেক ভুলের সম্ভাবনা ছিল। সেক্ষেত্রে কাজি আজিজুল হক তার গণিতের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নতুন একটি পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। তিনি আঙুলের ছাপ নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং এর শ্রেণীবিন্যাসের জন্য একটি গাণিতিক পদ্ধতি তৈরি করেন।
ব্রিটিশ পুলিশ বিভাগে কর্মরত অবস্থায় তিনি ১৮৯৪ সালে “Henry Classification System”-এর মূল গাণিতিক কাঠামো উদ্ভাবন করেন। তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতিই পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী অপরাধী শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটে এবং আজও আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে তাঁর এই উদ্ভাবন গবেষণা পদ্ধতি।
১৮৯৭ সালের দিকে, কাজি আজিজুল হক তার কর্মস্থলে সাত হাজার আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করেন। তার এই উদ্ভাবন, যা পরে ‘হেনরি সিস্টেম’ বা ‘হেনরি পদ্ধতি’ হিসেবে পরিচিত হয়, ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তকরণের জন্য একটি সহজ, সুনির্দিষ্ট এবং কার্যকর পদ্ধতি তৈরি করে। এই পদ্ধতিতে আঙুলের ছাপের উপর ভিত্তি করে এক হাজার ২৪টি শ্রেণী তৈরি করা হয়েছিল, যা সহজেই অপরাধী শনাক্তকরণের কাজে ব্যবহৃত হতো।
গবেষণার মৌলিকত্ব: কাজি আজিজুল হকের ফিঙ্গারপ্রিন্টের পদ্ধতি অনেক প্রথাগত পদ্ধতির থেকে অনেক সহজ ও কার্যকরী ছিল। কলিন বিভান, তার “ফিঙ্গারপ্রিন্টস” গ্রন্থে কাজি আজিজুল হকের গবেষণার মৌলিকত্ব সম্পর্কে লিখেছেন। বিভান বলেন, “আজিজুল হক অ্যানথ্রোপমেট্রিক পদ্ধতিতে কাজ করতে গিয়ে অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হন, কিন্তু তার ধারাবাহিক চেষ্টায় তিনি আঙুলের ছাপের একটি শ্রেণীবিন্যাসকরণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন।”
কাজি আজিজুল হক এই গাণিতিক পদ্ধতির মাধ্যমে আঙুলের ছাপের ৩২টি ভাগ বানান এবং সেগুলোর উপর ভিত্তি করে এক হাজার ২৪টি খোপ তৈরি করেন। এতে আঙুলের ছাপ বিশ্লেষণ অনেক সহজ হয়ে যায়, এবং যে কোন অপরাধীকে শনাক্ত করার প্রক্রিয়া দ্রুত ও সঠিক হয়ে ওঠে।
কর্মজীবন ও পদোন্নতি:কাজি আজিজুল হকের এই অসাধারণ আবিষ্কার তাকে পুলিশ বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হতে সাহায্য করে। তার কাজের পুরস্কৃত হিসেবে তাকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করা হয় এবং পাঁচ হাজার টাকা এবং একটি ছোটখাটো জমি দেওয়া হয়। তার কঠোর পরিশ্রম এবং উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনা তাকে পুলিশ বিভাগের এসপি (সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ) পদে পদোন্নতি দেয়।
মৃত্যুর পর:কাজি আজিজুল হক তার জীবনের শেষ দিনগুলো অবিভক্ত ভারতের চম্পারানে (বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যের একটি জেলা, যা উত্তর চম্পারান নামে পরিচিত) কাটান। তিনি সেখানে ১৯৩৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু পর, তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) চলে আসেন। তার পুত্র আসিরুল হক পুলিশের ডিএসপি হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং তার দুই বিখ্যাত নাতি ও নাতনি ছিলেন যথাক্রমে ইতিহাসের অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং শহীদ জায়া বেগম মুশতারী শফী।
সম্মাননা: ব্রিটেনের ‘দ্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট সোসাইটি’ কাজি আজিজুল হক এর অবদানকে স্মরণ করে “আজিজুল হক অ্যান্ড হেমচন্দ্র বোস প্রাইজ” নামে একটি পুরস্কার চালু করেছে। এই পুরস্কারটি ফরেনসিক বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের প্রদান করা হয়, যারা ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তকরণ বা অন্যান্য ফরেনসিক পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
কাজি আজিজুল হক এর অমূল্য অবদান আধুনিক ফরেনসিক সায়েন্সের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান থাকবে। তার উদ্ভাবিত ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তকরণের পদ্ধতি,আঙ্গুলের ছাপ শনাক্তকরণের পদ্ধতির উদ্ভাবক যা ‘হেনরি সিস্টেম’ নামে পরিচিত, বর্তমানে অপরাধীদের শনাক্তকরণে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার এই উদ্ভাবন পুলিশি তদন্তে একটি নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করেছে এবং আজকের আধুনিক সমাজে অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে অনন্য অবদান। তার জীবন এবং কাজ আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, মানবিক চিন্তা, কঠোর পরিশ্রম এবং উদ্ভাবন শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে পারে।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করে বিনয়ের সঙ্গে একটু বলতে চাই দুঃখজনক হলেও সত্য আজকে আমরা অপরাধী শনাক্তকরণে ফিঙ্গারপ্রিন্ট/আঙ্গুলের ছাপ পদ্ধতির উদ্ভাবক ‘খান বাহাদুর’ কাজি আজিজুল হক এর মৃত্যুর দীর্ঘ ৯১ বছর পর
২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো তাঁর জন্মভূমি বাংলাদেশে তাঁকে নিয়ে ইতিহাসের পাঠশালা ( দি একাডেমি অব হিস্ট্রি ) ১৯ মে আয়োজন করেন।
এই আয়োজন সফলতার জন্য ‘খান বাহাদুর’ কাজি আজিজুল হক এর মতো মহান ব্যক্তিকে যথাযথ মর্যাদা প্রদানে প্রত্যাশী সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
লেখক:সমাজ কর্মী ,ঢাকা, বাংলাদেশ।