G-VV5KW25M6F
Take a fresh look at your lifestyle.

রামিসা হত্যার রায় তিন মাসের মধ্যে কার্যকর সম্ভব আইনমন্ত্রী

0

অনলাইন ডেস্ক:  ঢাকার পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেই রায় কার্যকরের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি জানিয়েছেন, আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে আগামী তিন মাসের মধ্যেই এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং রায় কার্যকর করা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং বিচার বিভাগও এ ধরনের গুরুতর অপরাধের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যাপারে গুরুত্ব দিচ্ছে।

রোববার (৭ জুন) আইন মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের আইনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো মামলার রায় কার্যকর হওয়ার আগে নির্দিষ্ট কিছু সাংবিধানিক ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পর সাত দিনের মধ্যে মামলার নথিপত্র হাইকোর্ট বিভাগের কাছে ডেথ রেফারেন্স অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। এরপর মামলার পেপার বুক প্রস্তুত করা হবে এবং সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে তা সম্পন্ন হবে। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট বিভাগ মামলার শুনানি করে রায় বহাল রাখবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।

আইনমন্ত্রী ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমাদের আইনি বাধ্যবাধকতা হলো রায়ের সাত দিনের মধ্যে মামলার ফাইল হাইকোর্টে পাঠানো। এরপর পেপার বুক তৈরি হবে। এটি বাইরে করার সুযোগ নেই, সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানেই সম্পন্ন হয়। এরপর হাইকোর্টে শুনানি হবে এবং প্রয়োজনীয় বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হবে।”

রামিসা হত্যা মামলায় ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। পাশাপাশি সোহেলকে পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্নাকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থদণ্ডের টাকা আদায় করে ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

রায় ঘোষণার সময় বিচারক মাসরুর সালেকীন বলেন, আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা হয়েছে।

আইনমন্ত্রী অতীতের কয়েকটি আলোচিত মামলার উদাহরণ টেনে বলেন, বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার নজির বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় রয়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালে মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলা এবং বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রধান বিচারপতির বিশেষ নির্দেশনায় ওই মামলাগুলোর শুনানি ও নিষ্পত্তি দ্রুত সম্পন্ন হয়েছিল।

তিনি বলেন, “আমি যখন অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলাম, তখন দুইটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় বিশেষ ব্যবস্থায় দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছিল। একটি ছিল মেজর সিনহা হত্যা মামলা এবং অন্যটি আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা। তাই প্রয়োজন হলে রামিসার মামলাতেও একই ধরনের গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব।”

রামিসা হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে বলেও জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন যে, ডেথ রেফারেন্স সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে বিচার বিভাগ আরও মনোযোগী হবে। বিশেষ করে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

আইনমন্ত্রী বলেন, “প্রধান বিচারপতি আমাকে জানিয়েছেন, আদালত খোলার পর ডেথ রেফারেন্স মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। আমরা চাই যত দ্রুত সম্ভব এসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হোক।”

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আইনে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ নেই যার মধ্যে ডেথ রেফারেন্স বা আপিল নিষ্পত্তি করতে হবে। আদালতের নিজস্ব প্রক্রিয়া ও বিবেচনার ওপরই বিষয়টি নির্ভর করে। তবুও সরকার এবং আইন মন্ত্রণালয় আদালতের কাছে দ্রুত শুনানির আবেদন করবে।

আইনমন্ত্রী বলেন, “আইনে কোথাও বলা নেই কত দিনের মধ্যে ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে আমরা আদালতের কাছে অনুরোধ করব যাতে মামলাটি দ্রুত শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। এ বিষয়ে সলিসিটর উইং ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় যৌথভাবে কাজ করবে।”

তিনি আরও বলেন, দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; বিচার বিভাগের সক্রিয় সহযোগিতাও প্রয়োজন। রামিসা হত্যা মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার পেছনে প্রধান বিচারপতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। কারণ ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের নির্ধারিত ছুটি বাতিল না করা হলে এত অল্প সময়ে বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না।

আইনমন্ত্রী বলেন, “ফাস্ট ট্র্যাক বিচার শুধু সরকারের কারণে হয়নি। প্রধান বিচারপতি যদি বিচারকদের নির্ধারিত ছুটি বাতিল না করতেন, তাহলে এই বিচার এত দ্রুত শেষ করা সম্ভব হতো না।”

তিনি সম্ভাব্য সময়সীমা ব্যাখ্যা করে বলেন, যদি এক সপ্তাহের মধ্যে মামলার নথি হাইকোর্টে পৌঁছে যায়, এরপর ১৫ দিনের মধ্যে পেপার বুক প্রস্তুত করা যায় এবং বিশেষ বিবেচনায় দ্রুত শুনানি শুরু হয়, তাহলে হাইকোর্টে শুনানি দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ করা সম্ভব। এরপর মামলাটি আপিল বিভাগে গেলে সেখানেও দ্রুত শুনানি হলে তিন মাসের মধ্যে পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের আগে আইন অনুযায়ী সব স্তরের বিচারিক সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো আসামি চাইলে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যেতে পারবেন। আপিল বিভাগে রায় বহাল থাকলে পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করার সুযোগও রয়েছে। এসব আইনি অধিকার প্রয়োগের সুযোগ না দিয়ে তড়িঘড়ি করে রায় কার্যকর করা হলে তা নতুন আইনি বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

তিনি বলেন, “হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ এবং রিভিউ—সব আইনি ধাপ শেষ হওয়ার পরই রায় কার্যকর করা যায়। আইনের এই স্তরগুলো অনুসরণ না করে রায় কার্যকর করতে গেলে প্রশ্ন উঠবে এবং বিচারব্যবস্থার ওপরও প্রভাব পড়বে।”

রামিসা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে আইনমন্ত্রী আসামিদের মানসিকতা নিয়েও কঠোর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, অপরাধ সংঘটনের পরও আসামিরা বিচার প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পরও মামলায় নতুন ব্যক্তির নাম টেনে এনে তদন্তকে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রামিসা হত্যা মামলার দ্রুত বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আইনমন্ত্রী মনে করেন, এই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ভবিষ্যতে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা হিসেবে কাজ করবে এবং বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে আস্থা বাড়াবে। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আইন ও বিচার বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগে মামলার পরবর্তী ধাপগুলোও দ্রুত সম্পন্ন হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচারের পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে পাবে।

/এস.টি

Leave A Reply

Your email address will not be published.