আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা, দাফন ও স্মরণানুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সময়সূচি ঘোষণা করেছে ইরান সরকার। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পবিত্র মহররম মাসের প্রথম ১০ দিনের শোকানুষ্ঠান ও আশুরা পালন শেষে তাঁর দাফন সম্পন্ন করা হবে।
ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম ‘মেহের নিউজ’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয়াতুল্লাহ খামেনির স্মরণসভা আয়োজনের জন্য গঠিত বিশেষ উচ্চপর্যায়ের কমিটি মঙ্গলবার তাদের দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এতে জানাজা, দাফন, স্মরণসভা এবং দেশি-বিদেশি অতিথিদের অংশগ্রহণ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তুতির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়, ইমাম হুসাইন (আ.) এবং কারবালার শহীদদের প্রতি আয়াতুল্লাহ খামেনির গভীর শ্রদ্ধা, ধর্মীয় অঙ্গীকার এবং মহররমের শোকানুষ্ঠানের প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাই মহররমের প্রথম ১০ দিনব্যাপী শোকানুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর তাঁর জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই সময়ের মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং বিদেশে অবস্থানরত সমর্থক, ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও শুভানুধ্যায়ীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা আরও সুসংগঠিত করতে প্রয়োজনীয় সময়ও পাওয়া যাবে।
গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান
স্মরণসভা কমিটি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কিছু তথ্যকে ‘যাচাইবিহীন’ ও ‘মনগড়া’ বলে উল্লেখ করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, খামেনির দাফনের সময়, স্থান ও অনুষ্ঠানসংক্রান্ত নানা ধরনের ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, যা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
কমিটি স্পষ্টভাবে জানায়, জানাজা ও দাফনসংক্রান্ত সব ধরনের আনুষ্ঠানিক তথ্য শুধুমাত্র নির্ধারিত সরকারি সূত্র থেকেই প্রকাশ করা হবে। এর বাইরে প্রচারিত কোনো তথ্য বিশ্বাস না করার জন্য দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য লাখো মানুষের আগ্রহ রয়েছে। তাই ভুল তথ্য বা গুজব জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকেও ব্যাহত করতে পারে।”
বৈশ্বিক পরিসরে ঐতিহাসিক আয়োজনের প্রস্তুতি
এর আগে তেহরানের ইসলামি প্রচার সমন্বয় পরিষদের প্রধান মহসেন মাহমুদ জানিয়েছিলেন, আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজা শুধু ইরানের নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ও নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ইতোমধ্যে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ইরাক, লেবানন, সিরিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদেশি অতিথি, কূটনীতিক, ধর্মীয় প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি দল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের বিষয়ে প্রাথমিক যোগাযোগ করেছে বলে জানা গেছে।
নিরাপত্তা ও লজিস্টিক ব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব
স্মরণসভা কমিটি জানিয়েছে, সম্ভাব্য বিপুল জনসমাগমকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে। ইরানের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী, স্বাস্থ্য বিভাগ, জরুরি সেবা ইউনিট এবং জনপ্রিয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো যৌথভাবে কাজ করছে।
দূর-দূরান্ত থেকে আগত মানুষের জন্য অস্থায়ী আবাসন, খাদ্য, চিকিৎসা এবং পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাজধানী তেহরান ও আশপাশের এলাকায় বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও চালু করা হবে।
কমিটি জানিয়েছে, অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর জানাজা ও দাফনের স্থান, সময় এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির বিস্তারিত দেশবাসীর সামনে প্রকাশ করা হবে।
দীর্ঘ ৩৬ বছরের নেতৃত্ব
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ১৯৮৯ সালে ইরানের প্রতিষ্ঠাতা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর টানা প্রায় ৩৬ বছর ৬ মাস তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পদে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর নেতৃত্বে ইরান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, পারমাণবিক কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার এবং ইসলামী বিপ্লবের আদর্শ সংরক্ষণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন।
অন্যদিকে সমালোচকেরা তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তবে সমর্থক ও সমালোচক উভয়ের কাছেই তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত ছিলেন।
হামলা ও মৃত্যুর ঘটনা
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলার সময় তেহরানে নিজ কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন আয়াতুল্লাহ খামেনি। হামলায় তিনি নিহত হন। একই ঘটনায় তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান বলে জানানো হয়েছে।
এই ঘটনার পর ইরানজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ তাঁর স্মরণে শোকসভা, প্রার্থনা ও সমাবেশে অংশ নেয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে কয়েকদিনের শোকও ঘোষণা করা হয়।
ইরান সরকার বলছে, আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজা ও দাফন শুধু একজন রাষ্ট্রনেতার বিদায় নয়, বরং ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই অনুষ্ঠানকে মর্যাদাপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কমিটির ভাষ্যমতে, চূড়ান্ত সময়সূচি ও কর্মসূচির বিস্তারিত শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
সিতাজ/এস.টি