লোহাগাড়া প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। লিওনেল মেসির ব্যঙ্গাত্মক ছবি সংবলিত একটি ব্যানারকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে অন্তত চারজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
সোমবার (৮ জুন) উপজেলার সদর ইউনিয়নের কালোয়ার পাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে রয়েছেন আবুল কাশেম, মো. তৌহিদ, মো. জিসান এবং বশির উদ্দিন। তাঁদের সবাই কালোয়ার পাড়া এলাকার বাসিন্দা। স্থানীয়ভাবে তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে তাঁরা শঙ্কামুক্ত বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে এলাকায় কয়েক সপ্তাহ ধরেই উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছিল। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল—দুই দলের সমর্থকেরা নিজ নিজ দলকে সমর্থন জানাতে বিভিন্ন সড়ক, মোড় ও পাড়ায় পতাকা, ফেস্টুন এবং ব্যানার টানিয়ে রাখেন। বিশ্বকাপ মৌসুমে বাংলাদেশে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন নয়। তবে কখনও কখনও সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা উত্তেজনার জন্ম দেয়।
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল সমর্থকদের টানানো একটি ব্যানারে আর্জেন্টিনা দলের অধিনায়ক লিওনেল মেসির একটি ব্যঙ্গাত্মক ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। ব্যানারটি নিয়ে শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। তাঁরা ব্যানারটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য ব্রাজিল সমর্থকদের অনুরোধ করেন। তবে এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের দাবি, আর্জেন্টিনা সমর্থকদের একটি অংশ ব্যানারটিকে তাঁদের প্রিয় খেলোয়াড়ের প্রতি অসম্মানজনক বলে মনে করে। অন্যদিকে ব্রাজিল সমর্থকেরা বিষয়টিকে ফুটবলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে দেখছিলেন। এ নিয়ে কয়েকদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডাও চলছিল।
রোববার গভীর রাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, আর্জেন্টিনা সমর্থকদের একটি দল ওই ব্যানারটি খুলে ফেলে। ব্যানার অপসারণের খবর ছড়িয়ে পড়লে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায় এবং সংঘর্ষ শুরু হয়।
সংঘর্ষ চলাকালে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনায় চারজন আহত হন। স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। পরে এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উদ্যোগে উভয় পক্ষকে শান্ত করা হয়। আহতদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে এমন সহিংসতা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ফুটবল বিশ্বকাপ এলে বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে উন্মাদনা চরমে পৌঁছে যায়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশাল পতাকা টানানো, র্যালি, সমর্থক সমাবেশ এবং ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনা নিয়মিত দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব কার্যক্রম উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করলেও কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আবেগ ও উগ্র সমর্থন বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, খেলাধুলা মানুষের মধ্যে আনন্দ, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের বার্তা বহন করে। কিন্তু সমর্থনের নামে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিস্থিতিকে অযথা উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। তাই সমর্থকদের দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন।
ঘটনার বিষয়ে লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল্লাহ বলেন, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে একটি ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। খবর পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। পরে স্থানীয়ভাবে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা করে বিরোধ মীমাংসা করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে এবং এলাকায় কোনো ধরনের উত্তেজনা নেই। উভয় পক্ষকেই ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার মতো কোনো ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে পুলিশও সতর্ক রয়েছে।
এলাকার বাসিন্দারা আশা করছেন, খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে আর কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে না। তাঁদের মতে, ফুটবল বিশ্বকাপ আনন্দ ও উৎসবের উপলক্ষ হওয়া উচিত, বিরোধ বা সংঘর্ষের নয়। খেলোয়াড়দের প্রতি ভালোবাসা ও সমর্থন যেন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, সেটিই সবাই প্রত্যাশা করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে এবং খেলাধুলার প্রকৃত চেতনাকে সমুন্নত রাখতে সমর্থকদের আরও সহনশীল ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। কারণ ফুটবল মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত; তা যেন কখনো মানুষের মধ্যে বিভেদ বা সংঘাতের কারণ না হয়।