G-VV5KW25M6F
Take a fresh look at your lifestyle.

চট্টগ্রামের আলোচিত শিশু আয়াত হত্যা মামলায় আবীরের মৃত্যুদণ্ড

চার বছর পর রায়

0

আয়াত হত্যা মামলায় আদালতের রায়

চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত শিশু আলিনা ইসলাম আয়াত হত্যা মামলার রায়ে প্রধান আসামি আবীর আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তাকে ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডও করা হয়েছে।

বুধবার (১৭ জুন) চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মুহাম্মদ আলী আক্কাস এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা এই হত্যাকাণ্ডের প্রায় পৌনে চার বছর পর বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত এ রায় প্রদান করলেন।

যে ঘটনা কাঁদিয়েছিল পুরো দেশকে

২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরের ইপিজেড থানার নয়ারহাট এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার পাঁচ বছর বয়সী কন্যা আলিনা ইসলাম আয়াত প্রতিদিনের মতো আরবি পড়তে বাড়ির পাশের মসজিদে যাওয়ার জন্য বের হয়।

কিন্তু সেদিন আর ঘরে ফেরা হয়নি ছোট্ট আয়াতের।

শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবার, স্বজন এবং স্থানীয়রা ব্যাপক খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে এবং তদন্ত শুরু হয়।

তদন্তে উঠে আসে ভয়ংকর সত্য

তদন্তের একপর্যায়ে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয় প্রতিবেশী আবীর আলীকে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে আয়াতকে অপহরণ করেছিলেন আবীর। তবে অপহরণের পর শিশুটিকে কোথায় রাখা হবে সে বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা না থাকায় তিনি তাকে হত্যা করেন।

পরবর্তীতে মুক্তিপণের টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে আয়াতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। এজন্য একটি মোবাইল ফোনও সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

হত্যার পর লাশ টুকরো টুকরো

তদন্তে জানা যায়, হত্যার পর আবীর শিশুটির মরদেহ কয়েকটি অংশে বিভক্ত করেন এবং বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন।

এই তথ্য প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে জাতীয় গণমাধ্যম পর্যন্ত সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় ঘটনাটি।

পরবর্তীতে তদন্তকারী কর্মকর্তারা বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্র এবং শিশুটির ব্যক্তিগত কিছু আলামত উদ্ধার করেন।

উদ্ধার হয় গুরুত্বপূর্ণ আলামত

ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর আউটার রিং রোড এলাকার একটি স্থানে শিশুটির শরীরের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করা হয়।

এছাড়া তদন্তের সময় আবীরের বাসা থেকে সংগ্রহ করা রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সেই নমুনার সঙ্গে শিশু আয়াতের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়।

এই বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র

ঘটনার তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আরও পড়ুন:শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুততম বিচার, চট্টগ্রামে আলোচিত রায়

তদন্ত প্রতিবেদনে আবীর আলীকে প্রধান ও একমাত্র আসামি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়।

তদন্তে আবীরের বাবা, মা এবং বোনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।

তবে হত্যার ঘটনা সম্পর্কে জেনেও তথ্য গোপন করার অভিযোগে এক কিশোরের বিরুদ্ধে পৃথক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

আদালতে ৩৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য

মামলাটির বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ৩৩ জন সাক্ষী আদালতে উপস্থাপন করে।

সাক্ষীদের মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, আলামত সংগ্রহকারী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিরা ছিলেন।

তাদের সাক্ষ্য, ডিএনএ রিপোর্ট, উদ্ধারকৃত আলামত এবং আসামির দেওয়া তথ্য আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়।

দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত মামলার রায়ের জন্য দিন নির্ধারণ করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

আদালত মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক রিপোর্ট, ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে মত দেন।

এর ভিত্তিতেই আবীর আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়।

দেশের অন্যতম আলোচিত হত্যা মামলা

শিশু আয়াত হত্যা মামলা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

নিরাপত্তাহীনতা, শিশু সুরক্ষা এবং অপরাধ প্রতিরোধ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছিল এই ঘটনার পর।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের মামলায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেয় এবং ভবিষ্যতে অপরাধ প্রবণতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

শিশু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান

আদালতের রায় ঘোষণার পর অনেকেই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের চলাফেরা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সন্দেহজনক আচরণ দ্রুত শনাক্ত করা গেলে অনেক অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

চট্টগ্রামের শিশু আয়াত হত্যা মামলার রায় শুধু একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি নৃশংস অপরাধের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন। দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ঘোষিত এই রায় ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আরও পড়ুন:চট্টগ্রামে ঘরে ঢুকে মা-মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা,আহত শিশু

একই সঙ্গে এটি সমাজের জন্যও একটি বার্তা—শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ অব্যাহত থাকবে।

সিতাজ/এস.টি

Leave A Reply

Your email address will not be published.