আদালতের রায়ে মেয়রের দায়িত্ব পাওয়া বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেনকে চট্টগ্রাম সিটির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ স্থানীয় সরকার বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে পূর্ণকালীন প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে তিনি এবার সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচালনা করবেন।
নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং মেয়র হিসেবে তাঁর দায়িত্ব অব্যাহত রাখা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে এই নিয়োগ দেওয়া হলো। এর আগে মার্চ মাসেও তাঁকে প্রশাসক করার প্রস্তাব প্রস্তুত হয়েছিল, তবে সে সময় নিয়োগের আদেশ জারি হয়নি।
চট্টগ্রাম সিটির প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে যা বলা হয়েছে
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব জুয়েল রানা স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে শাহাদাত হোসেনকে পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের বিষয়টি জানানো হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ধারা ৪ অনুসারে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করবেন। দায়িত্ব পালনের জন্য বিধি অনুযায়ী মাসিক সম্মানী ও অন্যান্য ভাতা পাবেন। জনস্বার্থে জারি করা আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠেছিল?
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ নিয়ে গত ২৭ এপ্রিল প্রথম আলোতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের নথির বরাতে সেখানে বলা হয়, ২০২১ সালে নির্বাচিত পরিষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ওই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সেই হিসাবে পরিষদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয় ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি।
অন্যদিকে শাহাদাত হোসেন তখন দাবি করেছিলেন, আদালতের আদেশ অনুযায়ী তাঁর মেয়াদ ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। তবে স্থানীয় সরকার বিভাগের নথিতে উল্লেখ করা হয়, আদালত তাঁকে নির্বাচিত মেয়র ঘোষণা করলেও মেয়াদ সম্পর্কে পৃথক কোনো নির্দেশনা দেননি।
এই পরিস্থিতিতে গত মার্চে তাঁকে পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব তৈরি করা হয়। এর আগে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ।
২০২১ সালের নির্বাচন ও ফলাফল চ্যালেঞ্জ
২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন শাহাদাত হোসেন।
তখন ঘোষিত ফলাফলে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। শাহাদাত হোসেনের প্রাপ্ত ভোট দেখানো হয় ৫২ হাজার ৪৮৯।
নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে ফলাফল বাতিলের আবেদন করেন শাহাদাত। ওই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলায় তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নয়জনকে বিবাদী করা হয়।
আদালতের রায়ে যেভাবে মেয়র হন শাহাদাত হোসেন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রেজাউল করিম চৌধুরীকে মেয়রের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। একই বছরের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. তোফায়েল ইসলামকে করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এরপর ১ অক্টোবর শাহাদাত হোসেনের নির্বাচনী মামলার রায় দেন চট্টগ্রামের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ খাইরুল আমীন।
রায়ে রেজাউল করিম চৌধুরীকে নির্বাচিত ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাতিল করে শাহাদাত হোসেনকে নির্বাচিত মেয়র ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি ১০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেন আদালত।
সংশোধিত প্রজ্ঞাপন ও মেয়র হিসেবে শপথ
আদালতের নির্দেশনার পর ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে।
ওই বছরের ৩ নভেম্বর সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সম্মেলনকক্ষে তিনি শপথ নেন। তাঁকে শপথ পড়ান তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ।
নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রায় তিন বছর নয় মাস পর মেয়রের দায়িত্ব নিয়েছিলেন শাহাদাত। সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এবার চট্টগ্রাম সিটির প্রশাসক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের নতুন ভিত্তি তৈরি হলো।
সিতাজ/এস.টি
![]()



