মা হওয়ার আগেই নিভে গেল তানিয়ার জীবন!
পটিয়ায় অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যু, স্বামী আটক
চাটগাঁর তাজ ডেস্ক | চট্টগ্রাম |চার-পাঁচ বছরের ভালোবাসার সম্পর্ক। এরপর দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে। নতুন সংসার আর অনাগত সন্তানকে ঘিরে ছিল একরাশ স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই মাত্র ২০ বছর বয়সে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন তানিয়া কামাল নিহাত। চট্টগ্রামের পটিয়ায় নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এই গৃহবধূর মৃত্যুকে ঘিরে উঠেছে যৌতুকের দাবিতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ।
এ ঘটনায় তানিয়ার স্বামী নুর উদ্দিনকে (২৫) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
গভীর রাতে পটিয়ায় অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যু
রোববার (২৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের চরকানাই মোনাফ হাজির পাড়ায় ঘটনাটি ঘটে।
নিহত তানিয়া উপজেলার কুসুমপুরা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হরিণখাইন গ্রামের মোহাম্মদ কামালের মেয়ে। তাঁর স্বামী নুর উদ্দিন হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মোনাফ হাজির পাড়ার কাঞ্চন মিয়ার ছেলে।
প্রেমের বিয়ে, কয়েক মাসেই সংসারে অশান্তি
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তানিয়া ও নুর উদ্দিনের মধ্যে প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। দীর্ঘদিনের সেই সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই পরিবার তাঁদের বিয়ের আয়োজন করে।
বিয়ের পর নতুন জীবন শুরু করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁদের সংসারে অশান্তি দেখা দেয় বলে অভিযোগ স্বজনদের। বিশেষ করে যৌতুক ও উপহারসামগ্রী নিয়ে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবি তোলা হতো বলে পরিবারের অভিযোগ।
তানিয়া তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। সন্তান জন্মের অপেক্ষায় থাকা এই তরুণীর জীবন নিয়ে পরিবারের সদস্যদের স্বপ্নও ছিল অনেক। কিন্তু সন্তানের মুখ দেখার আগেই তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক।
যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ বাবার
তানিয়ার বাবা মোহাম্মদ কামালের অভিযোগ, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন নতুন পোশাক ও বিভিন্ন উপহার দাবি করেছিলেন। রমজান মাসে আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী সেসব দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
কিন্তু এরপরও নতুন করে কাপড়চোপড় ও যৌতুকের দাবি ওঠে। দাবি পূরণ করতে না পারায় তানিয়ার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ তাঁর বাবার।
পরিবারের দাবি, এসব নিয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একাধিকবার সালিশ-বৈঠক হয়। পারিবারিক বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
দোষীদের শাস্তির দাবি
পটিয়া উপজেলা কৃষকদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন জানান, দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কের পর দুই পরিবারের সম্মতিতেই তানিয়া ও নুর উদ্দিনের বিয়ে হয়েছিল।
বিয়ের কয়েক মাসের মাথায় এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
স্বামী পুলিশ হেফাজতে, ময়নাতদন্তে জানা যাবে মৃত্যুর কারণ
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক জানিয়েছেন, তানিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর স্বামী নুর উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
তানিয়ার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
স্বপ্নের সংসার থেকে শোকের ছায়া
ভালোবাসার মানুষকে জীবনসঙ্গী করে সুখের সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তানিয়া। অল্প কয়েক মাসের দাম্পত্য জীবনের মধ্যেই তিনি মা হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। অথচ সেই প্রত্যাশার সময়েই তাঁর মৃত্যু পরিবার ও স্বজনদের শোকাহত করেছে।
তানিয়ার মৃত্যুর পেছনে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগ কতটা সত্য এবং এ ঘটনায় কারও অপরাধমূলক ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটনের দাবি উঠেছে।
তানিয়ার মৃত্যু আরও একবার মনে করিয়ে দিল, যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগকে অবহেলা না করে যথাসময়ে আইনগত ও সামাজিক প্রতিকার নিশ্চিত করা কতটা জরুরি।
![]()