গ্রীন চট্টগ্রাম গড়তে ১০ লক্ষ গাছ লাগানোর লক্ষ্য পূরণ করতে হবে: প্রশাসক ডা. শাহাদাত
পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং একটি বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে ব্যাপক সবুজায়নের কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নগরীতে ১০ লাখ গাছ রোপণের যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের আরো দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন।
মঙ্গলবার সৌন্দর্যবর্ধন ও সবুজায়ন বিষয়ক সমন্বয় সভায় তিনি এসব নির্দেশনা দেন। সভায় প্রশাসক সড়কের বৃক্ষরোপণ এবং সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন। এ সময় তিনি নগরীর সড়ক ও উন্মুক্ত স্থানগুলোতে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের ঘোষণা দিয়েছেন। এটি একটি দূরদর্শী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। দেশের প্রতিটি নাগরিক যদি বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যায় এগিয়ে আসে, তাহলে একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
“এ লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সহযোগিতায় পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে নগরীতে ১০ লক্ষ গাছ রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১ বছরে বিমানবন্দর থেকে মোহরা এবং সিটি গেট থেকে কর্ণফুলী পর্যন্ত প্রায় ২ লক্ষ গাছ লাগানো হয়েছে। আগামী ১ বছরের মধ্যে নগরীতে ১০ লাখ গাছ রোপণের যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের আরো দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে।”
প্রশাসক আরো বলেন, নগরীর কালুরঘাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সব মিড-আইল্যান্ডকে ফুল ও সবুজে ভরিয়ে তোলা হচ্ছে। সড়কের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন খালি জায়গা, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেওয়ানহাট থেকে বারিক বিল্ডিং মধ্যবর্তী সড়কদ্বীপে জারুল, সোনালু, রাধাচূড়া, কামিনী, কাঞ্চন, হাসনাহেনা, গন্ধরাজ, শিউলিসহ প্রায় ১০ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় জাতের গাছ লাগানো হয়েছে। বিমানবন্দর এলাকায় শোভা ছড়াচ্ছে নানা রঙের ফুল। প্রতিদিন পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কারসহ এইসব গাছ রক্ষণাবেক্ষণেরও যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে গাছগুলোর ফোটা ফুল নাগরিকদের দিচ্ছে নান্দনিক আনন্দ।
প্রশাসক বলেন, এয়ারপোর্ট রোডের সৌন্দর্যবর্ধন নগরবাসীর প্রশংসা অর্জন করেছে। মানুষ সেখানে ছবি তুলছেন, সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। এটি সিটি কর্পোরেশনের জন্য গর্বের বিষয়। এ ধরনের উদ্যোগ নগরীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও সম্প্রসারণ করতে হবে। বিশেষ করে যেসব সড়ক ও স্থানে মানুষের চলাচল বেশি, সেগুলোকে নান্দনিকভাবে সাজিয়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, ফিরিঙ্গিবাজার সড়ক, কর্ণফুলী পার্কসংলগ্ন গোলচত্বর, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার এক্সেস রোড, চট্টগ্রাম কলেজ ও সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের সামনের সড়কসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে দৃষ্টিনন্দন করা সম্ভব। এসব স্থানে উপযুক্ত নকশা, সবুজায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে নগরীর সামগ্রিক পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।
সৌন্দর্যবর্ধনে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসক বলেন, বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করলেই যে একটি স্থান সুন্দর হবে, তা নয়। স্বল্প ব্যয়েও সঠিক পরিকল্পনা ও নান্দনিক নকশার মাধ্যমে আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে স্থপতি ও নকশাবিদদের মতামত নিয়ে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি সেখানে সাইকেল লেন স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। প্রশাসক বলেন, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে তুলতে সাইকেলবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন সড়ক ও গোলচত্বরগুলোও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য ও পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজাতে হবে।
নগরীর বিভিন্ন মিড আইল্যান্ড ও সড়ক বিভাজকের সৌন্দর্যবর্ধন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রবর্তক মোড়, গোলপাহাড়, মেডিকেল কলেজ এলাকা, সংলগ্ন গোলচত্বর এবং জামালখানসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর সৌন্দর্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে গাছ লাগানো, গ্রিল সংস্কার ও নান্দনিক নকশা সংযোজনের মাধ্যমে পরিবেশ আরও সুন্দর করে তুলতে হবে।
নগরীর জামালখান এলাকাসহ জনবহুল সড়কগুলোতে দেশের কীর্তিমান মানুষদের প্রতিকৃতি স্থাপন করার ঘোষণা দিয়ে প্রশাসক বলেন, কিছু এলাকায় কীর্তিমান মানুষদের স্থাপিত প্রতিকৃতি রং হারিয়েছে এবং পোস্টারে ঢাকা পড়েছে। বিদ্যমান ছবিগুলো অক্ষুণ্ন রেখে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কার করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ছবি ও তথ্য সংযোজনের মাধ্যমে ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানীদের এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতিও যথাযথভাবে তুলে ধরার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
নগরীর সৌন্দর্য ধরে রাখতে পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে ম্যাজিস্ট্রটদের দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, শুধু সৌন্দর্যবর্ধন করলেই হবে না, এসব স্থাপনা ও জনপরিসরের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে। ফুটপাত, পথচারীদের বসার বেঞ্চ ও উন্মুক্ত স্থানগুলো পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী কার্যক্রম প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে ডিসি হিল পার্কসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বিনোদনকেন্দ্রগুলোর পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রশাসক আরও বলেন, সৌন্দর্যবর্ধন ও সবুজায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। ইতোমধ্যে যেসব স্থানে উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হয়েছে, সেগুলোর মান বজায় রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন এলাকাকে পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, নান্দনিক ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করতে হবে।
সভায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মঈনুল হোসেন আলী জয় উপস্থিত ছিলেন।
![]()