মুসলিম ফুটবলারদের জন্য ফিফার নতুন উদ্যোগ
২০২৬ বিশ্বকাপে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি বিশেষ সম্মান
অনলাইন ডেস্ক: বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপ শুধু খেলাধুলার প্রতিযোগিতা নয়, এটি পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতি, জাতি, ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষের এক মিলনমেলা। প্রতি চার বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়া এই টুর্নামেন্টে বিশ্বের নানা প্রান্তের ফুটবলাররা নিজেদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। আর সেই বৈচিত্র্যকে আরও গুরুত্ব দিতে ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে ফিফা।
ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিগত পছন্দকে সম্মান জানিয়ে এবার ম্যাচসেরা খেলোয়াড়দের জন্য নতুন ব্যবস্থা চালু করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বিশেষ করে মুসলিম ফুটবলারদের জন্য এই সিদ্ধান্ত ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
কী পরিবর্তন আনছে ফিফা
বিশ্বকাপের ম্যাচসেরা খেলোয়াড় বা “Player of the Match” পুরস্কার দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের স্পন্সরশিপে পরিচালিত হয়ে আসছে। সাধারণত পুরস্কার গ্রহণের সময় খেলোয়াড়দের হাতে থাকা ট্রফি, ফটোসেশন ব্যাকড্রপ এবং বিভিন্ন প্রচারণামূলক উপকরণে স্পন্সর কোম্পানির লোগো প্রদর্শিত হয়।
কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে ফিফা এমন একটি ব্যবস্থা চালু করেছে, যার মাধ্যমে কোনো খেলোয়াড় যদি ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা ব্যক্তিগত কারণে অ্যালকোহল ব্র্যান্ডের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে না চান, তাহলে তিনি স্পন্সরবিহীন ট্রফি গ্রহণ করতে পারবেন।
একই সঙ্গে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত ব্যাকড্রপেও অ্যালকোহল ব্র্যান্ডের লোগোর পরিবর্তে বিশ্বকাপের নিজস্ব ব্র্যান্ডিং প্রদর্শন করা হবে।
মুসলিম ফুটবলারদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইসলাম ধর্মে মদ ও মদজাতীয় পানীয় হারাম হিসেবে বিবেচিত। ফলে অনেক মুসলিম খেলোয়াড় অ্যালকোহল ব্র্যান্ডের প্রচারণামূলক কার্যক্রমে অংশ নিতে অস্বস্তি বোধ করেন।
এর আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে মুসলিম ফুটবলারদের এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে দেখা গেছে। অনেকেই পুরস্কার গ্রহণ করলেও প্রচারণামূলক ছবিতে অংশ নেননি, আবার কেউ কেউ সরাসরি অস্বীকৃতিও জানিয়েছেন।
ফিফার নতুন নীতির ফলে এখন একজন মুসলিম ফুটবলার তার ধর্মীয় বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রেখেই ম্যাচসেরা পুরস্কার গ্রহণ করতে পারবেন।
যাদের মাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় আসে
সম্প্রতি মরক্কোর মিডফিল্ডার ইসমাইল সাইবারি ম্যাচসেরা নির্বাচিত হওয়ার পর পুরস্কার গ্রহণের সময় ফুটবল ভক্তদের নজরে আসে একটি ব্যতিক্রমী বিষয়। তার হাতে থাকা ট্রফিতে কোনো অ্যালকোহল ব্র্যান্ডের লোগো ছিল না।
পরবর্তীতে জানা যায়, এটি ফিফার নতুন ব্যবস্থার অংশ। শুধু সাইবারিই নন, আরও কয়েকজন মুসলিম ফুটবলার একই ধরনের স্পন্সরবিহীন ট্রফি গ্রহণ করেছেন।
- তাদের মধ্যে রয়েছেন
- মিসরের ইমাম আশুর
- জর্ডানের আলি অলওয়ান
- ইরানের রামিন রেজাইয়ান
- কাতারের গোলরক্ষক মাহমুদ আবুনাদা
- আইভরি কোস্টের ইয়ান দিয়োমান্দে
এই ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
শুধু মুসলিমদের জন্য নয়
ফিফার এই নীতি কেবল মুসলিম খেলোয়াড়দের জন্য প্রযোজ্য নয়।
যেকোনো ধর্মের খেলোয়াড় অথবা এমন কেউ, যিনি ব্যক্তিগত কারণে অ্যালকোহল ব্র্যান্ডের সঙ্গে নিজের নাম জড়াতে চান না, তিনিও এই সুবিধা নিতে পারবেন।
এছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। কারণ অনেক দেশে অ্যালকোহল-সম্পর্কিত বিজ্ঞাপনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের অংশগ্রহণ নিয়ে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।
আগেও এমন উদাহরণ ছিল
যদিও বিষয়টি অনেকের কাছে নতুন মনে হতে পারে, বাস্তবে ফিফা এর আগেও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল।
২০২৫ সালের ক্লাব বিশ্বকাপে মরক্কান তারকা আশরাফ হাকিমি ধর্মীয় কারণে স্পন্সরবিহীন ট্রফি গ্রহণ করেন। একই টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের তরুণ ফুটবলার এস্তেভাও, যিনি তখনও অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন, তাকেও বিকল্প ট্রফি প্রদান করা হয়েছিল।
এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বিশ্বকাপ পর্যায়ে নীতিটি আরও আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০১৮ বিশ্বকাপের সেই আলোচিত ঘটনা
ফুটবল বিশ্বে অ্যালকোহল স্পন্সরশিপ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়।
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে মিসরের গোলরক্ষক মোহাম্মদ এল-শেনাওয়ি ম্যাচসেরা নির্বাচিত হওয়ার পর অ্যালকোহল ব্র্যান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত পুরস্কার গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
তার সেই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে প্রশংসা ও বিতর্ক—দুই-ই সৃষ্টি করেছিল। অনেকেই এটিকে ধর্মীয় স্বাধীনতার উদাহরণ হিসেবে দেখেছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ওই ঘটনাই আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থাগুলোকে বিষয়টি নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছিল।
ফুটবলে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির নতুন দৃষ্টান্ত
বর্তমান বিশ্বে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরির মাধ্যম। তাই খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে সম্মান জানানো এখন ক্রীড়া প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ফিফার এই পদক্ষেপ দেখিয়ে দিয়েছে যে বাণিজ্যিক স্পন্সরশিপ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জন্যও একটি ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ফিফার নতুন উদ্যোগ ফুটবল বিশ্বে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। মুসলিম ফুটবলারসহ সব খেলোয়াড়ের ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সম্মান জানিয়ে সংস্থাটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
ফুটবল যখন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের আবেগের জায়গা, তখন এমন সিদ্ধান্ত কেবল খেলোয়াড়দের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনে পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হবে।
সিতাজ/এস.টি