G-VV5KW25M6F
Take a fresh look at your lifestyle.

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে শিল্পে চাপ, মূল্যস্ফীতির নতুন শঙ্কা

0

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশে আবারও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। নতুন মূল্যহার অনুযায়ী খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১ টাকা ৫২ পয়সা, ফলে প্রতি ইউনিটের নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। একইভাবে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বেড়ে হয়েছে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা। জুন মাস থেকেই নতুন এই মূল্য কার্যকর হবে।

সরকারের দাবি, বিদ্যুৎ খাতে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ কমানো এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা অধিকারকর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি পুরো অর্থনীতিতে একটি নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি—সবকিছু মিলিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে দেশ।

কেন বাড়ানো হলো বিদ্যুতের দাম?

বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি এবং কয়লার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। একই সঙ্গে ডলারের উচ্চ বিনিময় হার আমদানি ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। এর মধ্যে ৪০ হাজার কোটিরও বেশি ভর্তুকি সরকারকে বহন করতে হবে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করে বছরে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের আশা করা হচ্ছে। তবুও বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি অব্যাহত থাকবে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবেও জ্বালানি খাতে মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

উৎপাদন ব্যয় বাড়ার শঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ শুধু একটি সেবা নয়; এটি অর্থনীতির প্রায় সব খাতের চালিকাশক্তি। শিল্প, কৃষি, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি, কোল্ড স্টোরেজ, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা রয়েছে।

বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, টেক্সটাইল, প্লাস্টিক ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার ফলে উদ্যোক্তাদের অনেকেই পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হবেন। এর ফলে বাজারে নিত্যপণ্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম আরও বৃদ্ধি পাবে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল। তবে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং সেটির প্রভাব বাজারমূল্যে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটের পাশাপাশি সিস্টেম লস, অদক্ষতা এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধান না হওয়ায় জনগণের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এসব কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করে শুধু দাম বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান হতে পারে না।

মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে।

তার মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম এখনও অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এর মধ্যে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব ধাপে ধাপে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়বে। কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিল্প বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব

বাংলাদেশের শিল্প উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে উচ্চ সুদহার, ডলারের অস্থিরতা এবং জ্বালানি সংকটের কারণে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর সঙ্গে বিদ্যুতের নতুন মূল্য সংযোজন বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, বর্তমানে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ অনেক কমে গেছে। ব্যাংকগুলো উৎপাদনমুখী খাতে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। ফলে নতুন বিনিয়োগের গতি কমে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বর্তমানে প্রায় ৩ শতাংশের ঘরে রয়েছে। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয় শিল্প খাতকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, গত কয়েক মাসে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তার মতে, সরকার একদিকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সেই সহায়তার কার্যকারিতা কমিয়ে ফেলছে। মানুষের আয় যেভাবে বাড়ছে না, সেভাবে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার সিস্টেম লস কমাতে না পারার দায় গ্রাহকদের ওপর চাপানো উচিত নয়। আগে অপচয় ও অনিয়ম বন্ধ করতে হবে, তারপর মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা খুঁজতে হবে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনের সমালোচনা

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দুর্নীতি, অনিয়ম, সিস্টেম লস এবং ক্যাপাসিটি চার্জের সমস্যার সমাধান না করেই বারবার গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয় চাপানো হচ্ছে।

তার মতে, বিশ্বের অনেক দেশে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ বিদ্যুৎ সহায়তা বা বিল ছাড়ের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আরও কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমাতে সহায়তা করবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বিদ্যুৎ খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, সিস্টেম লস কমানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস, ক্যাপাসিটি চার্জ পুনর্বিবেচনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, শিল্প খাতের জন্য সহায়ক নীতি গ্রহণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। অন্যথায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়লেও এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি হয়তো আর্থিক বাস্তবতার কারণে অনিবার্য ছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতা এবং বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত সংস্কার। তা না হলে বারবার মূল্য সমন্বয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হবে।

/এস.টি

Leave A Reply

Your email address will not be published.