G-VV5KW25M6F
Take a fresh look at your lifestyle.

৪ সীমান্তে ৬০ জনকে পুশ ইন চেষ্টা বিজিবি কঠোর অবস্থান

0

অনলাইন ডেস্ক:  বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে আবারও পুশ ইন বা জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও নওগাঁ সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ অন্তত ৬০ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কঠোর অবস্থান নেওয়ায় তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেনি। ফলে এসব মানুষ বর্তমানে দুই দেশের সীমান্তবর্তী শূন্যরেখা ও নো ম্যান্স ল্যান্ডে অনিশ্চিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে আরও ২৮ জনকে পুশ ইন করার ঘটনায় নতুন করে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। তারা কয়েকদিন ধরে সীমান্তের নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করছেন। খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসহ মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে তাদের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে পুশ ইন ইস্যু আবারও দুই দেশের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অন্তত ১০টি পৃথক ঘটনায় প্রায় ৯০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এসব ঘটনা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, বরং মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত
ছবি: সংগৃহীত

লালমনিরহাট সীমান্তে একাধিক প্রচেষ্টা
লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অন্তত ৩৩ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবির দাবি, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং সীমান্ত টহল জোরদারের ফলে এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

আদিতমারী উপজেলার দীঘলটারী ও দুর্গাপুর সীমান্তে ১২ জনের একটি দলকে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করতে দেখা যায়। বিজিবি সদস্যরা তাদের সতর্ক করলে তারা আবার ভারতীয় অংশে সরে যায়। তবে তারা সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করতে থাকে।

একই সময়ে হাতীবান্ধা উপজেলার ফকিরপাড়া সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ১১ জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবির টহল দল স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের প্রবেশে বাধা দেয়। এছাড়া পাটগ্রামের ঝালাঙ্গী সীমান্ত দিয়ে আরও ১০ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হলে সেটিও প্রতিহত করা হয়।
বর্তমানে এসব ব্যক্তি সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে থাকলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।

বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে পরিস্থিতি অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে।
পঞ্চগড়ে খোলা আকাশের নিচে ১০ জন
পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে নারী ও শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। তবে বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দেয়।

শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ওই ১০ জনকে সীমান্তের শূন্যরেখায় বসে থাকতে দেখা যায়। কোনো দেশই তাদের নিজ নিজ ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। ফলে তারা খোলা আকাশের নিচে অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় পার করছেন।
জানা গেছে, ওই ১০ জনের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ, দুইজন নারী এবং তিনজন শিশু রয়েছে। সীমান্তের ফসলি জমিতে বসে থাকা এসব মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা স্পষ্ট।

এ ঘটনায় বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএসএফ দাবি করে, ওই ব্যক্তিরা বাংলাদেশের নাগরিক। তবে বিজিবি বলছে, তাদের নাগরিকত্ব যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কাউকে গ্রহণ করা হবে না।

বিজিবির কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন অনুসরণ না করে কাউকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানো গ্রহণযোগ্য নয়। নাগরিকত্ব প্রমাণ এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না।
নওগাঁ সীমান্তেও একই চিত্র
নওগাঁর সাপাহার উপজেলার হাপানিয়া সীমান্ত দিয়ে ১৭ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ।

বিজিবির দ্রুত পদক্ষেপে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
হাপানিয়া সীমান্তের একটি পিলার এলাকা দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ওই দলকে বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে আনা হয় বলে অভিযোগ। খবর পেয়ে বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের প্রবেশ ঠেকিয়ে দেয়।

বর্তমানে ওই ১৭ জন সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় জনগণও সীমান্ত এলাকায় সতর্ক নজরদারি চালাচ্ছেন।

নওগাঁ ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবৈধভাবে কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে মানবিক দিক বিবেচনায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে দীর্ঘ হচ্ছে দুর্ভোগ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে ২৮ জনের একটি দল কয়েকদিন ধরে নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশুরা রয়েছে।

বুধবার গভীর রাতে বিএসএফ তাদের বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয় বলে অভিযোগ। কিন্তু বিজিবির বাধার মুখে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি। এরপর থেকেই তারা সীমান্তের মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থান করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তাদের মধ্যে কয়েকজনের বাড়ি খুলনা অঞ্চলে। তারা কয়েক বছর আগে বিভিন্ন কারণে ভারতে গিয়েছিলেন। তবে তাদের নাগরিকত্ব ও অবস্থান নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক যাচাই চলছে।

ভারী বৃষ্টি, খোলা আকাশের নিচে অবস্থান এবং পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে তাদের দুর্ভোগ বেড়েছে। একজন বৃদ্ধা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলেও জানা গেছে।
বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এখনো কোনো সমাধান হয়নি। বিএসএফ পুশ ইন করার বিষয়টি স্বীকার করেছে বলে বিজিবি জানিয়েছে, তবে তাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।

মানবিক সংকট ও আন্তর্জাতিক আইন
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে পুশ ইন শুধু নিরাপত্তাজনিত বিষয় নয়; এটি একটি মানবিক ইস্যুও। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে জোরপূর্বক অন্য দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। নাগরিকত্ব যাচাই, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে কাউকে সীমান্তে ফেলে রাখা মানবাধিকারের প্রশ্ন তৈরি করে।

বর্তমানে সীমান্তে অবস্থান করা নারী ও শিশুদের অবস্থা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। প্রচণ্ড গরম, বৃষ্টি এবং খাদ্য সংকট তাদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং নারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিজিবির কঠোর অবস্থান
বিজিবি বারবার বলছে, যাচাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্তে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। পুশ ইন প্রতিরোধে অতিরিক্ত টহল ও গোয়েন্দা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
বিজিবির মতে, সীমান্তে যেসব ব্যক্তি অবস্থান করছেন তাদের পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বিষয়টি কূটনৈতিক পর্যায়েও আলোচনায় রয়েছে।

উদ্বেগ বাড়ছে সীমান্তজুড়ে
সীমান্তে একের পর এক পুশ ইন চেষ্টার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর মানুষ বলছেন, এমন ঘটনা বাড়তে থাকলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে দ্রুত সমন্বয় ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান প্রয়োজন। অন্যথায় সীমান্তে মানবিক সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

বর্তমানে লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে অবস্থানরত প্রায় ৯০ জন মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। তারা কোন দেশের নাগরিক, কোথায় তাদের স্থায়ী ঠিকানা এবং শেষ পর্যন্ত তাদের কী পরিণতি হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

সীমান্তের নো ম্যান্স ল্যান্ডে আটকে থাকা এসব মানুষের জীবন যেন দুই দেশের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থমকে আছে। আর এই বাস্তবতা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, সীমান্ত শুধু ভূখণ্ডের বিভাজন নয়, অনেক সময় মানুষের জীবনেরও কঠিন এক পরীক্ষার নাম।

/এস.টি

Leave A Reply

Your email address will not be published.