অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ: জামায়াত আমির
সিতাজ ডেস্ক: জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে এবং জাতির সঙ্গে প্রকৃত অর্থে ইনসাফ করতে পারেনি। তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকার যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করত, তাহলে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি আরও ইতিবাচক অবস্থানে পৌঁছাতে পারত।
মঙ্গলবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে দলের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত ‘ছায়াবাজেট’ উপস্থাপনকালে তিনি এসব মন্তব্য করেন। রাজধানীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের অর্থনীতি, রাজস্ব ব্যবস্থা, নির্বাচন, সুশাসন এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে নিজের দলের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একটি দেশের উন্নয়ন কেবল বড় অঙ্কের বাজেট প্রণয়নের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় না। উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সৎ নেতৃত্ব, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। তিনি মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাষ্ট্র পরিচালনায় এসব উপাদানের ঘাটতি ছিল এবং তার ফলেই জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতির সঙ্গে ইনসাফ করতে পারেনি। তারা যদি ইনসাফ করতে পারত, তাহলে দেশের চিত্র ভিন্ন হতো। জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে ছিল, তার পূর্ণ প্রতিফলন আমরা দেখতে পাইনি।”
নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন
বক্তব্যে সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচন নিয়েও মন্তব্য করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া মোটামুটি সুষ্ঠু হলেও নির্বাচনের ফলাফলে জনগণের প্রকৃত প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি। তাঁর মতে, একটি নির্বাচন কেবল ভোটকেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নির্বাচনী পরিবেশ, অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সমতা এবং জনগণের আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তিনি বলেন, “নির্বাচনের দিনে ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু হয়েছে—এ কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু ফলাফল জনগণের প্রত্যাশার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটিয়েছে কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দেশের মানুষ যে ধরনের প্রতিনিধিত্ব আশা করেছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের এমন বক্তব্য ভবিষ্যতে সংসদীয় রাজনীতিতে আরও আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিকেও নতুন করে সামনে আনতে পারে।
বাজেট বাস্তবায়নে সততা ও জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্ব
ছায়াবাজেট উপস্থাপনকালে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাজেটের আকার বড় হলেই সেটি সফল হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা।
তিনি বলেন, “আমরা যে বাজেট পেশ করছি, তা বাস্তবায়নের জন্য সততা ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য। সততা না থাকলে এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে যত বড় বাজেটই দেওয়া হোক না কেন, তার কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।”
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়, অনিয়ম এবং দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে জনগণের কষ্ট কমানো সম্ভব নয়। বাজেটের প্রতিটি টাকা যেন জনগণের কল্যাণে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে।
করব্যবস্থার সংস্কারের দাবি
দেশের বিদ্যমান কর ও রাজস্ব ব্যবস্থার সমালোচনা করে জামায়াতের আমির বলেন, বর্তমান ট্যাক্সেশন ব্যবস্থায় নানা ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে করদাতারা হয়রানির শিকার হন এবং সরকারও সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হয়।
তিনি বলেন, “দেশের করব্যবস্থাকে আরও জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে হবে। এমন একটি রাজস্ব কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে করদাতারা স্বেচ্ছায় কর দিতে উৎসাহিত হবেন এবং একই সঙ্গে কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ কমে আসবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। ফলে উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সরকারকে প্রায়ই ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ অবস্থায় রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থবছর পরিবর্তনের প্রস্তাব
অনুষ্ঠানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি জানান, অর্থবছরকে ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করবে বিরোধী দল।
বর্তমানে বাংলাদেশে অর্থবছর জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত গণনা করা হয়। তবে অনেক দেশ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থবছর অনুসরণ করে। ডা. শফিকুর রহমান মনে করেন, ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে অর্থবছরের সমন্বয় ঘটালে পরিকল্পনা গ্রহণ, বাজেট বাস্তবায়ন এবং হিসাব ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হতে পারে।
তিনি বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে অর্থবছরের সামঞ্জস্য রয়েছে। বাংলাদেশেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।”
জনগণই হবে বাজেটের বিচারক
নিজেদের প্রস্তাবিত ছায়াবাজেট সম্পর্কে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত জনগণই হবে বাজেটের প্রকৃত বিচারক। বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, “আমরা যে বাজেট পেশ করতে যাচ্ছি, তার আসল বিচারক হবে জনগণ। যদি কোনো প্রস্তাব জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তাহলে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে আমাদের সহযোগিতা করবেন। আমরা জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিই।”
৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার ছায়াবাজেট
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত ছায়াবাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। দলটির দাবি, এ বাজেট জনকল্যাণ, সুশাসন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে।
ছায়াবাজেটে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং যুবকদের কর্মসংস্থানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
দলটির নেতারা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখাই তাদের বাজেট ভাবনার মূল লক্ষ্য।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, ছায়াবাজেট উপস্থাপনের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী শুধু অর্থনৈতিক প্রস্তাবই দেয়নি, বরং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। নির্বাচন, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা, সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং রাজস্ব সংস্কার নিয়ে দলটির বক্তব্য ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সঙ্গে ‘ইনসাফ করতে পারেনি’—এই মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। অন্যদিকে, বাজেট বাস্তবায়নে সততা ও জবাবদিহিতার ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলমান আলোচনাকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।
সার্বিকভাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত ছায়াবাজেট এবং দলের আমিরের বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। এখন দেখার বিষয়, জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে অর্থনৈতিক নীতিমালা নিয়ে কী ধরনের বিতর্ক ও মতবিনিময় সামনে আসে এবং জনগণ সেই প্রস্তাবগুলোকে কীভাবে মূল্যায়ন করে।