G-VV5KW25M6F
Take a fresh look at your lifestyle.

দেশের কারাগারে ভয়াবহ বন্দী সংকট, ধারণক্ষমতার ১.৭ গুণ বন্দী, সংসদে চাঞ্চল্যকর তথ্য

দেশের কারাগারগুলোতে বাড়ছে বন্দীর চাপ

0

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে বন্দীর সংখ্যা ক্রমেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫টি কারাগারে বর্তমানে অনুমোদিত ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় ১.৭ গুণ বেশি বন্দী অবস্থান করছেন। ফলে অনেক কারাগারেই আবাসন, নিরাপত্তা এবং বন্দীদের জীবনযাত্রা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বুধবার (১৭ জুন) জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ এ তথ্য প্রকাশ করেন। সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশের কারাগারগুলোর বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন।

কতজন বন্দী রয়েছে দেশের কারাগারে?

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫টি কারাগারের মোট অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৩৬ জন। কিন্তু বাস্তবে বর্তমানে সেখানে বন্দী রয়েছেন ৭৭ হাজার ৪০ জন।

অর্থাৎ ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ৩১ হাজার ৯০৪ জন বন্দী কারাগারে অবস্থান করছেন।

এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে বাংলাদেশের কারাগারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অতিরিক্ত চাপের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

বর্তমান বন্দীদের সংখ্যা

মোট বন্দী: ৭৭,০৪০ জন

পুরুষ বন্দী: ৭৪,০৩৬ জন

নারী বন্দী: ২,০৭৭ জন

কারাগারের অনুমোদিত ধারণক্ষমতা: ৪৫,১৩৬ জন

কেন বাড়ছে কারাগারের ওপর চাপ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার বৃদ্ধি এবং দ্রুত বন্দী পুনর্বাসনের সীমাবদ্ধতা কারাগারগুলোতে অতিরিক্ত ভিড়ের অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বন্দী এখনও বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছেন। ফলে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের কারাগারেই থাকতে হচ্ছে।

এর ফলে শুধু আবাসন সংকটই নয়, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

আবাসন সংকটের কথা স্বীকার করল সরকার

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, অতিরিক্ত বন্দীর কারণে দেশের বিভিন্ন কারাগারে আবাসন সংকট তৈরি হয়েছে।

অনেক কারাগার তাদের নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দী ধারণ করছে। এতে বন্দীদের জন্য নির্ধারিত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

কারা প্রশাসনের জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ

কারাগারগুলোর ওপর চাপ কমাতে সরকার ইতোমধ্যে কয়েকটি নতুন কারাগার চালু করেছে।

বর্তমানে চালু হওয়া কারাগারগুলো হলো:

বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগার (কেরানীগঞ্জ)

সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২

ফেনী জেলা কারাগার-২

খুলনা জেলা কারাগার-২

এসব কারাগার চালুর ফলে কিছুটা চাপ কমলেও সার্বিক সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

শিগগির চালু হচ্ছে আরও তিনটি কারাগার

সরকার জানিয়েছে, খুব শিগগিরই আরও তিনটি নতুন কারাগার চালু করা হবে।

এগুলো হলো:

কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-২

মাদারীপুর জেলা কারাগার-২

পিরোজপুর জেলা কারাগার-২

নতুন কারাগার চালু হলে বন্দীদের আবাসন সুবিধা কিছুটা বাড়বে এবং বিদ্যমান কারাগারগুলোর ওপর চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চলমান নির্মাণ প্রকল্প

দেশের কারা অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে:

ময়মনসিংহ কারাগার পুনর্নির্মাণ

কুমিল্লা কারাগার পুনর্নির্মাণ

জামালপুর কারাগার পুনর্নির্মাণ

নরসিংদীতে নতুন কারাগার নির্মাণ

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্প শেষ হলে কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা আরও ২ হাজার ৯৫৫ জন বৃদ্ধি পাবে।

ফলে দেশের কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা দাঁড়াবে ৪৮ হাজার ১৩১ জনে।

আরও যেসব কারাগার আধুনিকায়ন করা হবে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি কারাগার পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে:

রাজশাহী কারাগার

রংপুর কারাগার

নোয়াখালী কারাগার

রাঙামাটি কারাগার

খাগড়াছড়ি কারাগার

এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের কারাগার ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি আসবে বলে মনে করছে সরকার।

মানবাধিকার ও বন্দীদের জীবনমানের প্রশ্ন

কারাগারে অতিরিক্ত বন্দী থাকার বিষয়টি শুধু অবকাঠামোগত সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বন্দীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং মানসিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনেক সময় এসব সেবা যথাযথভাবে দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে বন্দীদের জীবনমান এবং সংশোধনমূলক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

যদিও সরকার নতুন কারাগার নির্মাণ ও পুরনো কারাগার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে, তবুও শুধুমাত্র অবকাঠামো বৃদ্ধি করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে:

বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি

বিকল্প শাস্তি ব্যবস্থা

জামিন প্রক্রিয়া সহজীকরণ

পুনর্বাসন কার্যক্রম শক্তিশালী করা

কারাগার ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন

এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশের কারাগারগুলো বর্তমানে ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি বন্দীর চাপ বহন করছে। সংসদে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৪৫ হাজারের বেশি ধারণক্ষমতার বিপরীতে ৭৭ হাজারেরও বেশি বন্দী অবস্থান করছেন।

সংকট মোকাবিলায় সরকার নতুন কারাগার নির্মাণ ও পুরনো কারাগার সম্প্রসারণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কারাগার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, দ্রুত বিচার এবং বন্দী পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা না গেলে এই সংকট আরও প্রকট হতে পারে।

সিতাজ/এস.টি

Leave A Reply

Your email address will not be published.