নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের হাজার হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান ধারক আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা ‘চাটগাঁইয়া’ বা চট্টগ্রামী ভাষা। এই ভাষার প্রবাদ-প্রবচন, শব্দভাণ্ডার, ভাষাগত বৈশিষ্ট্য ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ও ভাষাপ্রেমীদের অংশগ্রহণে এক বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত ৯ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার, বিকেল ৩টায় চট্টগ্রাম নগরীর সুগন্ধা আবাসিক এলাকার ‘ একত্র’ র সেমিনার কক্ষে ইতিহাসের পাঠশালা (দি একাডেমি অব হিস্ট্রি বাংলাদেশ)-এর উদ্যোগে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রবীণ শিক্ষাবিদ, কবি ও কথাশিল্পী দীপিকা বড়ুয়া।
প্রধান অতিথি ও আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক,বিশিষ্ট ড. মুহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন ফারুক।
সভায় ইতিহাসবেত্তা ও ইতিহাসের পাঠশালার পরিচালক সোহেল মো. ফখরুদ-দীন চট্টগ্রামের প্রাচীন আঞ্চলিক ভাষার প্রায় তিন হাজার শব্দের অর্থ, উৎপত্তি, ভাষাগত অবস্থান এবং প্রবাদ-প্রবচনের ওপর একটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামী ভাষা কেবল একটি আঞ্চলিক ভাষা নয়; এটি এ জনপদের মানুষের ইতিহাস, জীবনচর্চা, লোকজ জ্ঞান, কৃষি-সংস্কৃতি, নদী – সামুদ্রিক ঐতিহ্য ও সামাজিক পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ বাহক, যাহা কোটি কোটি এ জনপদের মানুষের গৌরবের প্রতীক।
আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন পটিয়া খলিল মীর কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ ও ভাষাবিদ মোহাম্মদ মুসা সিকদার, শিক্ষাবিদ ও কবি কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার, লেখক ও প্রাবন্ধিক লায়ন দুলাল কান্তি বড়ুয়া, চাটগাঁইয়া ভাষার গবেষক ও সংগ্রাহক ছড়াকার উৎপল কান্তি বড়ুয়া,
প্রবীন শিক্ষাবিদ ও কবি অধ্যাপক জিতেন্দ্র লাল বড়ুয়া, প্রবীণ শিক্ষাবিদ কবি ও প্রাবন্ধিক নীহারেন্দু বড়ুয়া, সাহিত্যসেবী লেখক সাইদ নজরুল ইসলাম,আলোরপথের সম্পাদক
সাংবাদিক সোহেল তাজ, চট্টগ্রাম গবেষক অধ্যাপক ডা. ডি. কে. ঘোষ, কোরান গবেষক মোহাম্মদ হোসাইন সহ বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ।
বক্তারা বলেন, বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভাবে অনেক প্রাচীন ভাষা ও উপভাষা পৃথিবী থেকে বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের মুখের ভাষা চট্টগ্রামী ভাষাও নানা কারণে সংকটের মুখোমুখি। নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাতৃভাষার চর্চা কমে যাওয়া, প্রাচীন শব্দের ব্যবহার হারিয়ে যাওয়া এবং ভাষাটির পর্যাপ্ত গবেষণা ও নথিভুক্তির অভাবে এ ভাষার অমূল্য সম্পদ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।
বক্তারা আরও বলেন, চট্টগ্রামী ভাষার শব্দভাণ্ডার, প্রবাদ-প্রবচন, লোকসাহিত্য, গান, ছড়া, কিংবদন্তি, মৌখিক ইতিহাস ও ভাষাগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপক গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামে একটি স্থায়ী ‘চট্টগ্রামী আঞ্চলিক ভাষা যাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এ যাদুঘরে প্রাচীন শব্দ, লোককথা, পুঁথি, অডিও-ভিডিও সংরক্ষণ, ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা, অভিধান প্রণয়ন এবং ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
বৈঠকে বক্তারা অভিমত ব্যক্ত করেন যে, চট্টগ্রামী আঞ্চলিক ভাষা সংরক্ষণ মানে শুধু একটি ভাষাকে রক্ষা করা নয়; বরং হাজার হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য ও একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা। তাই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে চট্টগ্রামী ভাষাকে সংরক্ষণ, গবেষণা ও বিকাশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
সভা শেষে চট্টগ্রামী ভাষার প্রবাদ-প্রবচন,
শব্দভাণ্ডার ও ভাষা সংরক্ষণে ধারাবাহিক গবেষণা, অভিধান প্রণয়ন এবং ‘চট্টগ্রামী আঞ্চলিক ভাষা যাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সিরাজ/এস.টি