G-VV5KW25M6F
Take a fresh look at your lifestyle.

হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রাহ:) এক অলৌকিক আধ্যাত্মিক সাধকের জীবন

সোহেল মো. ফখরুদ-দীন

0

আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলায় অবস্থিত বটতলী গ্রাম, ইউনিয়ন বা প্রাচীন একটি জনপদ । বঙ্গোপসাগরের খুবই কাছে, রুস্তমহাট এখানেই হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়ার ( রাহ:) এর দরবার শরীফে চিরনিদ্রায় শায়িত আধ্যাত্মিক সাধক হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহঃ)। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের এক প্রখ্যাত আল্লাহর অলী ও ইসলাম প্রচারক। মরমী চেতনার মহান সাধক। বার আউলিয়ার অন্যতম অলি বলা হয় তাঁকে। চট্টগ্রামে মুসলমান মিশনারীদের মধ্য তিনি অন্যতম। চট্টগ্রামে অলি আউলিয়া ( রাহ:) দের মধ্য আজোও হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া খুবই প্রভাবময়ে আধ্যাত্মিক শক্তিমান।

সোহেল মো. ফখরুদ-দীন
সোহেল মো. ফখরুদ-দীন

‘ চট্টগ্রামে মুসলমান ‘(১ম খন্ড ) ও ‘চট্টগ্রামে মুসলমান আগমনের ইতিকথা ‘ গ্রন্থে ইতিহাসবেত্তা সোহেল মো.ফখরুদ-দীন লিখেছেন, ” প্রাচীন এই চট্টগ্রামের মাটিতে আরব দেশ হতে নূর নবী হযরত মুহম্মদ ( সা:) এর পবিত্র ইসলাম ধর্মের আগমনী বার্তা নিয়ে এদেশের চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষকে ধন্য করেছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সা:) এর সাহাবী হযরত সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.)। হযরত সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) আরবভূমি থেকে সমুদ্র পথে এই চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে সুদূর চীন গমন করেন। তাঁর নেতৃত্বে ৭ম হিজরিতে ৫ জন সাহাবী এই চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে চীন গমন করেন “। ইতিহাস থেকে আমরা বুঝতে পারি চট্টগ্রামে মুসলমান আগমন ও বিস্তার বহু আগে থেকে। হযরত রাসুলে খোদা ( সা:) এর যুগে ইসলাম ধর্মের সুচনা এই চট্টগ্রামে। সেই পুত:পবিত্র ইসলাম ধর্ম প্রথম যুগ থেকে এখানে বা বঙ্গদেশে সুফি সাধক ও অলি গন বহন করে সাধারণ মানুষের কাছে এনেছে।

চট্টগ্রামে শাহ মোহছেন আউলিয়া অলিদের মধ্য তাঁদের একজন। উপমহাদেশের বিখ্যাত ইসলামীচিন্তাবিদ, দার্শনিক ও ফার্সি ভাষার কবি, ইমামে আহলে সুন্নত, আল্লামা গাজী সৈয়দ মুহাম্মদ আযীযুল হক শেরে বাংলা (রাহ:) রচিত ‘ দিওয়ান ই আযীয ‘ গ্রন্থে হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া সম্পর্কে ফার্সি ভাষায় চন্দে চন্দে লিখেছেন, ” দর মদহে একে- আয দোয়া-যদাহ আউলিয়া- / মাযহারে কারা-মা-তে ‘আজী-বাহ / মাহবু-বে সাইয়্যেদুল আম্বিয়া-/ ওয়া পে-শওয়া-য়ে- কেবা-রে আউলিয়া-/ হযরত শা-হ মুহসিন চাটগামী-‘আলায়হি রাহমাতু রাব্বিহিল বা-রী/। বার আউলিয়ার একজন, আজব কারামত সমূহের প্রকাশস্থল, নবীকুল সর্দারের প্রিয়ভাজন, শীর্ষস্থানীয় ওলীগণের মধ্যে নেতৃস্থানীয় হযরত শাহ মুহসিন চাটগামী (মহান স্রষ্টা ও রব তাঁর উপর দয়া বর্ষণ করুন।)-এর প্রশংসায় তিনি আরো লিখেছেন,
” আয বরা – য়ে শাহ মহসিন সদ হাযারা মারহাবা / আয দোয়া – যদাহ আউলিয়া উ রা বেদা নী বে খত্বা “।
উচ্চারিত ফার্সি ভাষার বাংলা অনুবাদ : হযরত শাহ মুহসিনকে শত সহস্র মুবারকবাদ। তিনি বার আউলিয়ার অন্যতম বলে জেনে রেখো। একথা নির্ভূল। ( হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া কে শেরে বাংলা (রাহ:) মুসহিন আউলিয়া লিখেছেন ) ।
আমার কবিতায় হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া ( রাহ:) কে আমি –
” দ্বীন ইসলামের মিশনারী / প্রচারে কোরআন হাদিসের বাণী / দেশ সমুদ্র নদী পার হয়ে – এলেন বঙ্গ মাটি ধরি / শাহ মোহসেন, শাহ বদর, শাহ চাঁন্দ অলি / চট্টগ্রামে জিন ভূতের রাজ্য রাজত্বে / আবাদ নিলো আগুনের বাতি আর মাটির ছড়ি / আজানের আহবান – আল্লাহ আকবর / শামিল হলো অলি পীরের দলে /
মানুষ ছিলো দুনিয়া – আখিরাতে / মোহসেন আউলিয়া আনোয়ারা সাগরতলে / শাহ চাঁন্দ নিলো পাহাড় শ্রীমাই নদের কূলে / বদর উদ্দিন – বদর আউলিয়া চাটগাঁ নিলো ; জিন ভূত তাড়ি /
মানুষের সমাগমে দ্বীনের ইসলাম, জাগ্রত হলো হলো কলমার ঈমান / মুসলমান মিশনারি- মোহসেন, শাহ চাঁন্দ ও বদর আউলিয়ার বাড়ী ; হলো বিজয়ে ইসলামের পতাকা বাহী – রাসূলে খোদার বাণী “। আরও পড়ুন: হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রাহ:) এক অলৌকিক আধ্যাত্মিক সাধকের জীবন

এরকম অজস্র কাব্য কবিতায় চট্টগ্রামের এই মহান অলি হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়াকে স্মরণ করছে শত শত বছর ধরে।
শাহ্‌ মোহছেন আউলিয়া ইয়েমেন দেশের বাসিন্দা ও সেখানে জন্মগ্রহণ করেন। হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রাহঃ) ৮৮৬ হিজরী, ১৪৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়ালে জন্মগ্রহণ করেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। তিনি তাঁর পিতা ও পরিবারের কাছ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা গ্রহন করেন।

তাসাউফ ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের পর তিনি তাঁর মামা, প্রখ্যাত পীর হযরত শাহসুফি সৈয়দ বদর শাহ্‌ (রাহ:) এর সাথে দিল্লি আসেন। কিছুদিন পরে বাংলার রাজধানী গৌড়ে আসেন। সেখান থেকে হযরত মোহছেন আউলিয়া (রহ.) এবং হযরত বদর শাহ্‌ (রহ.) সমুদ্র পথে আধ্যাত্মিকতায় একটি পাথরকে বাহন বানিয়ে সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামে আসেন। এরপর ইসলাম প্রচার শুরু করেন এবং বহু মানুষ তাঁদের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেন।

চট্টগ্রামের মহান অলি হযরত বদর আউলিয়া (রহঃ) এর ভাগিনা হিসেবে তাঁর রুহানিয়াতের যাত্রা শুরু হয়, এবং মামা-ভাগিনার এই রুহানী সম্পর্ক ইসলামী ঐতিহ্যে বিশেষভাবে গুরুত্ব আজোও সুফিবাদ, মরমীবাদ চর্চায় যুক্ত সাধকের কাছে মহান মর্যাদবান। হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহঃ) ইসলামের আলো ছড়াতে সমুদ্রপথে চট্টগ্রামের উপকূলে আগমন করেন। চট্টগ্রামের আনোয়ারার ঝিয়রী গ্রামের শঙ্খ নদীর তীরে অবস্থান নেন।

অবস্থানের প্রথম দিকে সেখানে এক বোবা ছেলেকে হুজুর কথা বলাতে সক্ষম হওয়ার অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়ার আধ্যাত্মিক শক্তির প্রমাণ মেলে। তাঁর ইচ্ছায় গ্রামবাসীরা সেখানে একটি ঘর নির্মাণ করে দেন। সেখানে তিনি আল্লাহর এবাদতে মশগুল হন। ৯৮৫ হিজরী, ১৫৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ৬ আষাঢ় হযরত মোহছেন আউলিয়া (রহঃ) ইন্তেকাল করেন এবং তাঁকে তাঁর সাধনাস্থল ঝিয়রী গ্রামে দাফন করা হয়। শঙ্খ নদীর ভাঙনের কারণে পরবর্তীতে স্বপ্নাদেশে তাঁকে স্থানান্তর করে বটতলী গ্রামে পুনরায় দাফন করা হয়। তাঁর ব্যবহৃত পাথরখানাও দরবার শরীফে সংরক্ষিত আছে। মাজার শরীফে প্রবেশ করে এই পাথর সবাই দেখতে পারে, সেখাবে একটি বক্সে করে রাখা হয়েছে।

প্রাচীন এ পাথরকে স্থানীয়রা মোহছেন আউলিয়ার কিস্তি বলেন। এটি কি পাথর না অন্য কিছু এই নিয়ে ইতিহাসে মতের বিবাদ আছে। আধ্যাত্মিকতা সাধনায় মরমীবাদের প্রজন্ম এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদায় দেখেন এবং এই পাথর থেকে ভালোবাসায় উপকার পেয়েছেন এমন অনেক অনেক লোকজনের সাথে এই লেখক কথা বলেছেন। এই পাথর সম্পর্কে ঐতিহাসিক ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের গবেষনা এখানে উল্লেখ করা হলো,

” The block of stone by which Muhsin Awliya is said to have come to Jhiori floating is now beside the saint’s tomb at Battali. It is now much venerated by the illiterate Hindus and Muslims. Votive candles are generally burnt on this. When I first heard about this stone, it at once occured to me that the stone might have been an inscription but nobody assured me about it being an inscription,

except that old and venarable literateur Md. Abdul Karim S.B. of Chittagong, with whom I went to examine the stone last year (1931). After a good deal of difficulty we succeeded to discover that it is a Persian inscription in Toghra character. It is now not in a good condition. Half of the writtings has been rubbed out. We took the impression of the inscription, tried to read it but could not. Now with the help of Mr. Shamusddin an expert of the Indian Museum, we decipherd the following text of this inscription.”।

ঐতিহাসিক ড. মুহম্মদ এনামুল হক এর গবেষনার এই বিষয়ে ঐতিহাসিক অধ্যাপক ড. আবদুল করিম তাঁর রচিত ‘ চট্টগ্রামের ইসলমী ঐতিহ্য ‘ গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন।
” بتاریخ بستم ماه شوال عابد مجذوب ”
এতে পাথরে তিনটি লাইনের অস্তিত্ব থাকলেও দুই লাইন পড়া যাচ্ছেনা। একটি পড়া যাচ্ছে, তার বর্ননা : “ শাওয়াল মাসের বিশ তারিখে (একজন) আবিদ ও মজযূব (আল্লাহর প্রেমে আত্মহারা সাধক)।”
উল্লেখিত গবেষনা ও শিলালিপি সম্পর্কে ঐতিহাসিক অধ্যাপক ড. আবদুল করিম বলেছেন, ” এই শিলালিপির তারিখ ৮০০ পড়েছেন তাও গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ সুলতানী আমলের শিলালিপিতে সংখ্যায় তারিখ দেওয়ার রেওয়াজ কোন শিলালিপিতে এই পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। যদিও শিলালিপির ভাষা এবং তারিখ সম্পর্কে ড. এনামুল হকের অভিমত গ্রহণযোগ্য নয় “।

বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ডক্টর গোলাম সাকলায়েন হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়ার মাজারে রক্ষিত পাথর গবেষনা করে লিখেছেন। তিনি এই পাথর গবেষনার মাধ্যমে হযরত বদরপীরের জন্মের ইতিহাস লিখেছেন।আলোচিত হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া ও বদর আউলিয়ার সম্পর্ক গভীর ও ঐতিহাসিক তা বুঝা কঠিন নয়। ডক্টর গোলাম সাকলায়েন লিখেছেন, ” চট্টগ্রামে মুহসিন আউলিয়ার মাযারে উৎকীর্ণ প্রস্তর ফলক থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারা যায় যে, পীর বদর শাহ্ ১৩৯৭ খৃস্টাব্দে জীবিত ছিলেন। সুতরাং ইনি একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি-জনশ্রুতি নির্ভর নন। চট্টগ্রামের জনসাধারণ যে বদর পীরের এত প্রশংসা, সম্মান ও ভক্তি-শ্রদ্ধা করে থাকে, তিনি জনশ্রুতি-নির্ভর হতে পারেন না। চট্টগ্রামে পীর বদরের প্রভাব বিশেষভাবে বর্তমান আছে। যে এলাকায় পীর বদরের সমাধি-ভবন আছে তার নাম বদরপাতি (বদর পট্টি) “।

বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ শেহাবুল হুদা তাঁর রচিত ‘ চট্টগ্রামের সুফি সাধক ও দরগাগ ‘ গ্রন্থে লিখেছেন,
” শাহ মোহছেন আউলিয়ার দরগা ছিল আনোয়ারা থানার ঝিয়ারি গ্রামে। পরবর্তী সময়ে এটি সরিয়ে পাশ্ববর্তী গ্রাম বটতলিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এখনও দরগাটি সেখানেই রয়েছে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত নানা কিংবদন্তি এবং এই আউলিয়ার বংশধরদের কাছ থেকে তার সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো: কথিত আছে যে, একদা মখদুম শাহ বদর উদ্দিন বদর-ই-আলম জাহিদি, সাহারানপুর জেলার সিওয়ানে যার মাজার অবস্থিত, তার সঙ্গে মোহছেন আউলিয়া পানিপথ হয়ে গৌড়ে আসেন। তারা এখানে বসবাস করতে চাননি এবং তাই ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেন। তারা জলপথে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিলেন।

তারা তিন ধরনের ভাসমান বস্তু ব্যবহার করেছেন-কাঠের একটি তক্তা, একটি কাতলা মাছ ও পাথরের একটি বড় ব্লক। মোহছেন আউলিয়া জলযান হিসেবে শেষোক্ত বস্তুটি ব্যবহার করেন। তিনি ঝিয়ারি গ্রামে পৌছালেন, সেখানে স্থায়ী হলেন এবং হিন্দুদের মধ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করলেন। এই তপস্বীর কোনো পুত্র ছিল না, তবে নির্মাই বিবি নামে এক কন্যা ও শাহ সিকান্দার নামে এক ভ্রাতুষ্পুত্র ছিল। বাংলার উদ্দেশে ঘর ছাড়ার আগে আউলিয়া তার কন্যাকে তার ভ্রাতুষ্পুত্রের সঙ্গে বিবাহ দিলেন। কিন্তু তিনি যেহেতু দীর্ঘ সময়ের জন্য বাড়ি ফিরছিলেন না, তার কন্যা ও জামাতা তার সন্ধানে বাংলায় চলে আসেন ” । তাঁরা এসে আর ফিরে যান নি। ঝিয়রিতে বসবাস স্থাপন করেন। নির্মাই বিবি ও তাঁর স্বামী সিকান্দার। তাঁদের সংসারে শাহ কুতুব উদ্দিন নামে এক পুত্র ছিলেন বলে ডা. মুহম্মদ শিহাবুল হুদা লিখেছে।

হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া ( রাহ:) এর জীবনী নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ইতিহাসবিদ আলহাজ্ব মাওলানা এম. ওবাইদুল হক তাঁর রচিত ” বাংলাদেশের পীর আউলিয়ারগন ” গ্রন্থে ‘ বার আউলিয়া’ নামক ঐতিহাসিক কিতাবের ৫৫ পৃষ্ঠার বরাদ দিয়ে লিখেছেন, ” চট্টগ্রামে এসে শহর থেকে বার মাইল ব্যবধানে অবস্থিত কুড়াইল্লামোড়া নামীয় পাহাড়ে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। সেখানে হেয়ানাই নামীয় নাপিতকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন। সে নব মুসলমানের দুই ছেলে আত্মারাম মহিষচন্দ্রও মুসলমান হয়েছিল।

প্রথম ছেলের মুসলমানী নাম আতিকুল্লাহ, দ্বিতীয় ছেলের নাম মোহাম্মাদ শরীফ রাখা হয়েছিল। দুই জনই মুসলমান হয়ে এবাদাত ও রিয়াযাত করতে লাগলেন। তখনকার অমুসলমান বাদশাহ তাঁদের এবাদাত রিয়াযাত দেখে অনেক জায়গা জমিন তাঁদেরকে দান করেছিলেন। শাহ বদর (র.) এবং তাঁর পুত্র শাহ কাত্তাল (র.) গৌড় থেকে চলে যাওয়ার পরই শাহ মোহসেন (র.) চট্টগ্রামে তাশরীফ আনেন। তাঁর সঙ্গে একখানা বড় পাথর ছিল, যে পাথরখানা বর্তমানে তাঁর মাযারের উপরই রয়েছে। সঙ্গে তাঁর কন্যা নরমেল বিবি, আর জনৈক ভ্রাতুষ্পুত্র শাহ সেকান্দর এবং নরমেল বিবির পুত্র কুতুবুদ্দীনও এসেছিলেন “।

অন্য দিকে বিশিষ্ট লেখক গবেষক ড. হেলাল উদ্দিন মুহাম্মদ নোমান তাঁর রচিত ” সাহাবায়ে কেরাম ( রা:) এর চট্টগ্রাম সফর ” গ্রন্থে তিনি হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া ( রাহ:) সম্পর্কে লিখেছেন, ” বখতিয়ার মাহির সওয়ারের সাথে এক খানা পাথরে চড়ে সমুদ্র পথে চট্টগ্রামে আসেন।সে পাথর মাজারে এখনো সংরক্ষিত। তিনি বদর শাহের ভাগ্নে ছিলেন “।

হযরত মোহছেন আউলিয়া ( রাহ:) এর বহনকারী পাথর সম্পর্কে আমি ৫০ অধিক বিভিন্ন লেখক গবেষকের বর্ননা পড়েছি। আধুনিকতা ও বিজ্ঞানের সাথে এর মিল করা কঠিন। তবে আধ্যাত্বিকতা বিশ্বাসের সাথে পাথর বা মোহছেন আউলিয়া কিস্তি খুবই মর্যাদাবান। মরমী চর্চায় সুফিবাদে এই পাথরের মর্যাদা অসীম। আমি বহুবার এই মাজার জিয়ারতে গিয়েছি। পাথরটি এখনো সংরক্ষিত আছে।

আধ্যাত্মিক অলৌকিকতা ও কারামাত: হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহঃ) এর জীবনে বহু অলৌকিক ঘটনা রয়েছে। তাঁর কারামাতের অন্যতম উদাহরণ হলো বোবা শিশুদের মুখে বুলি ফোটানো। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার জুলেখা ও বাঁশখালীর এক কিশোরীর মুখে তাঁর দরবারের তবারুক গ্রহণের পর বুলি ফোটে, এই ঘটনা প্রমাণ করে তাঁর রুহানিয়াত আজও জীবিত। এছাড়াও সাগরে ডুবে যাওয়া জেলে মৃত্যুর মুখ থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এবং তাঁর মান্নাত পূরণ করার ঘটনাও হযরতের অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণ।

দরবার শরীফের পরিচালনা ও ধর্মীয় শৃঙ্খলা : হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহঃ) এর দরবার শরীফ ইসলামী শরীয়তের পূর্ণ অনুসরণে পরিচালিত হয়। এখানে নারী জেয়ারতকারীদের জন্য পর্দা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয় এবং নামাজের সময় দরবারের প্রধান ফটক বন্ধ রাখা হয়। এই দরবার শরীফের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন হযরতের তিন আওলাদের বংশধরদের দ্বারা গঠিত ‘দরগাহ পালা কমিটি’, যাদের নেতৃত্বে রয়েছেন তিনজন মতওয়াল্লী।

 

এ দরগাহ কমিটি মোগল আমলে প্রাপ্ত ঐতিহাসিক “নবাবী সনদ”-এর উপর ভিত্তি করে পরিচালনা করে আসছে। যদিও বর্তমানে ঐ ১০ দ্রোন জমি ওয়ারিশদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তবে সনদটি দরগাহ কমিটির কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানাযায়, তবে আমি সন্ধান করেও পাইনি বা দেখেনি।

ইতিহাসের সাক্ষী চাটি প্রদীপ : চট্টগ্রাম শহরের নামের উৎপত্তির সাথে যে “চাটি” প্রদীপের ইতিহাস জড়িত, তা হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহঃ) ও হযরত বদর আউলিয়া (রহঃ) এর কেরামতের স্মারক। তাঁরা জ্বিন-পরীদের বিতাড়নের উদ্দেশ্যে চাটির আলো জ্বালিয়ে নির্দিষ্ট জায়গা আবাদ করেন। আজও দরবার শরীফে ঐতিহ্যবাহী চাটি জ্বালানো হয়, এবং চাটির তেল রোগ মুক্তির উদ্দেশ্যে ভক্তদের মাঝে বিতরণ করা হয়।

বিরূপ আচরণ ও তার পরিণতি : দরবার শরীফকে তিরস্কার করায় এলাকার পারকি গ্রামের এক ধনাঢ্য পরিবার পরিণতিতে মেয়েকে হারিয়ে বসে এবং পরবর্তীতে অলৌকিকভাবে মেয়েটির দরবারে ফিরে আসা তাদেরকে সত্য উপলব্ধি করায়। অবশেষে তারা দরবারের প্রতি ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং বিবাহ সম্পন্ন করে সম্মানের সাথে মেয়েটিকে তুলে দেয়। এমন অলৌকিক ঘটনা সমাজে অলিদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে।
হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহঃ) ছিলেন ইসলামের এক নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক, যাঁর কারামাত, আধ্যাত্মিকতা ও মানবিকতা আজও মানুষের হৃদয়ে বিশ্বাস ও আশ্রয়ের প্রতীক। তাঁর দরবার শরীফ ইসলাম ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রস্থল হয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অসংখ্য মানুষকে রুহানী শান্তি দান করছে। আল্লাহ পাক এই মহান অলির উসিলায় আমাদের জীবনকে বরকতপূর্ণ করুন। এক সময় এই প্রাচীন মাজারটি পাকা ও ছনের ছাউনিতে তৈরি ছিল। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আলহাজ্ব এম. মনজুর আলম বহু টাকা ব্যয় করে একটি দৃষ্টিনন্দন মাজার ভবন তৈরি করে দেন। মাজার শরীফটি ২০২৪ সালে নতুন করে তৈরি করা মাজার শরীফ উদ্বোধন করা হয়। মাজার যাবার পথে একটি বড় গেইট রয়েছে।

এই গেইটটি সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী ড. কর্নেল (অব:) অলি আহমদ বীরবিক্রম তৈরি করেছেন। প্রতিদিন আনোয়ারা বটতলী রুস্তম হাট- হযরতশাহ মহোসেন আউলিয়া (রাহ:) এর মাজার শরীফে হাজার হাজার লোক জিয়াড়তে উপস্থিত হন। বার্ষিক ওরশে লক্ষ জনতা উপস্থিত হন। মাজার শরীফের ১/২ মাইল এলাকায় পাড়া মহল্লায় গরু ছাগল মহিষ জবেহ করে বিরিয়ানি রান্না করে ফাতেহা দেন। বাড়ীতে বাড়ীতে মেহমান আসেন। মাজার শরীফে লোকে লোকারণ্য থাকে। ২০২৬ সালে মহান এই সুফি সাধকের জীবন ও কর্মেরপ্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

লেখক: সভাপতি, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র ( সিএইচআরসি) ; পরিচালক ও সম্পাদক, দি একাডেমি অব হিস্ট্রি ( ইতিহাসের পাঠশালা )।
ই মেইল : chrc1994@gmail.com
মোবাইল নাম্বার : ০১৯৫৬৯৯৬৪২৪

Leave A Reply

Your email address will not be published.