অনলাইন ডেস্ক: রাজধানীতে চিকিৎসা পাওয়ার দীর্ঘ সংগ্রামের পর অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেলেন মানসিক ভারসাম্যহীন নারী দুলালী। তার মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিই নয়, বরং সমাজের অসহায় ও পরিচয়হীন মানুষের চিকিৎসা প্রাপ্তির বাস্তবতাকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
রোববার সকালে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুলালীর মৃত্যু হয়। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, গুরুতর শারীরিক জটিলতার কারণে তার অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটেছিল। বিশেষ করে তীব্র রক্তস্বল্পতা, শরীরে প্রয়োজনীয় খনিজ ও লবণের ভারসাম্যহীনতা এবং সংক্রমণজনিত জটিলতা তার জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তির সময় থেকেই দুলালীর শারীরিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। চিকিৎসার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
অসহায় অবস্থায় উদ্ধার
দুলালীর গল্পটি জনসম্মুখে আসে কয়েকদিন আগে। স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবিক কর্মী মুছা করিম রিপন তাকে অসুস্থ ও অসহায় অবস্থায় দেখতে পান। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা এই নারী নিজের পরিচয়ও স্পষ্টভাবে জানাতে পারছিলেন না। তার শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল।
প্রথমে তাকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নেওয়া হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করা যায়নি। পরে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু নানা কারণে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করতে বিলম্ব হয় বলে জানা যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা
দুলালীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে মুছা করিম রিপন একপর্যায়ে সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেন। তিনি একটি প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থান নেন এবং দুলালীর চিকিৎসার দাবি জানান। বিষয়টি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
অনেক সাধারণ মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক তার চিকিৎসার পক্ষে সোচ্চার হন। মানবিক এই উদ্যোগ দেশের বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সরকারি পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসা
জনমত তৈরি হওয়ার পর দুলালীকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে নিবিড় চিকিৎসা শুরু করেন।
সরকারের পক্ষ থেকেও তার চিকিৎসা তদারকির কথা জানানো হয়েছিল। চিকিৎসকরা জানান, দীর্ঘদিনের অবহেলা, অপুষ্টি এবং শারীরিক দুর্বলতার কারণে তার শরীরে একাধিক জটিলতা তৈরি হয়েছিল। চিকিৎসার মাঝপথে অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
শেষ পর্যন্ত বাঁচানো গেল না
চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দুলালীর অবস্থার উন্নতি হয়নি। রোববার সকালে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেন অনেকেই।
যারা তার চিকিৎসার জন্য সোচ্চার ছিলেন, তারা দুলালীর মৃত্যুতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে সমাজে অসহায় ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের জন্য আরও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
একটি প্রশ্ন রেখে গেল দুলালীর গল্প
দুলালীর মৃত্যু অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পরিচয়হীন, অসহায় বা মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসা পাওয়ার পথ কতটা সহজ? জরুরি পরিস্থিতিতে তারা কীভাবে দ্রুত চিকিৎসা সেবা পেতে পারে? এসব বিষয় আবারও আলোচনায় এসেছে।
অনেকের মতে, দুলালীর ঘটনা সমাজের মানবিক দায়িত্ববোধের একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে এটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা এবং অসহায় মানুষের জন্য আরও কার্যকর সহায়তা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
দুলালী আর নেই, কিন্তু তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা মানবিক উদ্যোগ এবং সমাজের সহমর্মিতার গল্প দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এই লেখাটি সংবাদপোর্টাল, ব্লগ বা অনলাইন নিউজ ফিচার হিসেবে প্রকাশের উপযোগী করে এসইও বিবেচনায় তৈরি করা হয়েছে।
/এস.টি