অনলািইন ডেস্ক: বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় অর্থের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আইনগত সীমা নির্ধারণ থাকলেও বাস্তবে সেই সীমা কতটা মানা হয়, তা নিয়ে সন্দেহের শেষ নেই। সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জমা দেওয়া ব্যয় বিবরণীকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী দলটির ব্যয় সীমার মধ্যে থাকলেও প্রার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক।
নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব কেন আলোচনায়?
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী কোনো রাজনৈতিক দল দুই শতাধিক প্রার্থী দিলে তারা সর্বোচ্চ সাড়ে চার কোটি টাকা পর্যন্ত নির্বাচনী ব্যয় করতে পারে। একইসঙ্গে প্রতিটি প্রার্থীকে দলীয়ভাবে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জামায়াতের জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, তারা প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার ব্যয় দেখিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় চার কোটি টাকা বিভিন্ন প্রার্থীর জন্য অনুদান হিসেবে ব্যয় হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে এসেছে। কারণ হিসাব অনুযায়ী অনেক প্রার্থীকে দেড় লাখ টাকার বেশি, এমনকি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে। ফলে আইন নির্ধারিত সীমা অতিক্রম হয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর জমা দেওয়া ব্যয় বিবরণী পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আইনের সঙ্গে কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কমিশনের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে নির্বাচনী ব্যয় বাস্তবে কত হয়েছে এবং কাগজে-কলমে কত দেখানো হয়েছে, তা যাচাই করা সহজ নয়।
নির্বাচনের সময় হাজারো প্রার্থী ও অসংখ্য প্রচারণামূলক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কমিশনের হাতে সবসময় থাকে না। ফলে ব্যয়সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণ করাও অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে।
জামায়াতের ব্যাখ্যা কী?
দলটির নেতারা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আগে কোনো আপত্তি জানানো হয়নি। তাদের দাবি, নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতের ব্যয় একাধিকভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব এবং হিসাবের ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ থাকলে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাবে।
তাদের আরও বক্তব্য, বাস্তবে অনেক রাজনৈতিক দল নির্বাচনে যে অর্থ ব্যয় করে, জমা দেওয়া রিটার্নে তার পুরো চিত্র উঠে আসে না। ফলে শুধু একটি দলের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে বৃহত্তর সমস্যাটি আড়াল হয়ে যায়।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যয়ের বাস্তবতা
বাংলাদেশে নির্বাচন এলেই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ ওঠে। পোস্টার, ব্যানার, জনসভা, পরিবহন, কর্মী ব্যবস্থাপনা, গণসংযোগ ও প্রচারণাসহ বিভিন্ন খাতে কোটি কোটি টাকা খরচ হয় বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্বাচনী ব্যয়ের সরকারি হিসাব বাস্তবতার তুলনায় অনেক কম দেখানো হয়। অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর জমা দেওয়া ব্যয় বিবরণী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক দলই শূন্য ব্যয় দেখিয়েছে অথবা বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় অত্যন্ত কম খরচের তথ্য দিয়েছে।
এ অবস্থায় নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বিদ্যমান কাঠামোতে কেবল ব্যয়সীমা নির্ধারণ করলেই যথেষ্ট নয়; কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কী প্রয়োজন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের ব্যয়ের তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা।
স্বাধীন অডিট ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যয় যাচাই করা।
নির্বাচনের সময় বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা।
ব্যয়সীমা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তির ব্যবস্থা রাখা।
রাজনৈতিক দলগুলোর বার্ষিক আয়-ব্যয়ের অডিট রিপোর্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করা।
এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে ভোটারদের আস্থা বাড়বে এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অর্থের অস্বচ্ছ প্রভাব কমানো সম্ভব হবে।
সামনে কী বার্তা দিচ্ছে এই বিতর্ক?
জামায়াতের নির্বাচনী ব্যয় নিয়ে ওঠা প্রশ্ন কেবল একটি দলের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক নির্বাচনী অর্থায়ন ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। আইন থাকলেও যদি তার কার্যকর প্রয়োগ না হয়, তাহলে ব্যয়সীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্য অনেকটাই ব্যর্থ হয়ে যায়।
সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং ভবিষ্যতের জাতীয় নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে এখনই নির্বাচনী ব্যয় তদারকির আধুনিক ও কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ গণতন্ত্রের শক্তি শুধু ভোটগ্রহণে নয়, বরং সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্যেই নিহিত।
নির্বাচনী ব্যয় নিয়ে বর্তমান বিতর্ক তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে শুধু হিসাব জমা দিলেই কি দায় শেষ, নাকি সেই হিসাবের সত্যতা যাচাই করার সময়ও এসে গেছে?
/এস.টি