খুচরা পর্যায়ে ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির আভাস; লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য আপাতত থাকছে স্বস্তি
অনলাইন ডেস্ক: ঈদুল আজহার পরপরই দেশের কোটি কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহকের জন্য নতুন ব্যয়ের চাপ আসতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আজ বিদ্যুতের নতুন ট্যারিফ বা মূল্যহার ঘোষণা করতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। তবে স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য চালু থাকা ‘লাইফলাইন’ সুবিধায় আপাতত কোনো পরিবর্তন না আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির খবরে সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ বিদ্যুতের দাম বাড়ার অর্থ শুধু মাসিক বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি নয়; বরং এর প্রভাব পড়বে উৎপাদন খরচ, পরিবহন, কৃষি, শিল্প এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে।
আজই আসছে চূড়ান্ত ঘোষণা
বিইআরসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকালে কমিশনের কারিগরি কমিটির বৈঠকে মূল্যবৃদ্ধির হার চূড়ান্ত করা হবে। এরপর বিকেলে নতুন ট্যারিফ ঘোষণা করা হতে পারে। নতুন মূল্যহার কার্যকর ধরা হবে ১ জুন থেকে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, কারিগরি কমিটি দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে এবং কমিশন শিগগিরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানাবে।
সূত্রগুলো বলছে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের নীতিগত সম্মতি আগেই রয়েছে। এখন শুধু কতটুকু বাড়ানো হবে, সেটি নির্ধারণ করা হচ্ছে।
কেন বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুতের দাম?
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, কয়লার দাম এবং ডলারের উচ্চ বিনিময় হার বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের ভর্তুকির চাপও ক্রমাগত বাড়ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে তাদের সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ভর্তুকি দিতে হবে।
এ অবস্থায় ভর্তুকির বোঝা কিছুটা কমানোর জন্য বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আইএমএফের শর্তও গুরুত্বপূর্ণ
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে নেওয়া ঋণের বিভিন্ন শর্তের মধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানোর বিষয়টি অন্যতম।
দুই মাস আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত একটি মন্ত্রিসভা কমিটি বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি ১ টাকা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল।
বিইআরসি এখন সেই সুপারিশের আলোকে মূল্য সমন্বয়ের কাজ করছে। কতটা বাড়তে পারে দাম?
গণশুনানিতে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি বিভিন্ন হারে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছিল।
প্রস্তাব অনুযায়ী বিপিডিবি: ৮৫ পয়সা
আরইবি: ১ টাকা ৭৭ পয়সা
ডিপিডিসি: ১ টাকা ৫৪ পয়সা
ডেসকো: ১ টাকা ৯৮ পয়সা
ওজোপাডিকো: ১ টাকা ৩৯ পয়সা
নেসকো: ২ টাকা ৫ পয়সা
অন্যদিকে বিইআরসির কারিগরি কমিটি গড়ে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২৫ পয়সা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে ইউনিটপ্রতি ১ টাকার কম বৃদ্ধির সম্ভাবনা খুবই কম।
ধাপে ধাপে বাড়বে বিল
জানা গেছে, কমিশন গ্রাহকভিত্তিক ধাপে ধাপে মূল্যবৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে।
২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম হারে মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে। এরপর ২০০-৪০০ ইউনিট, ৪০০-৬০০ ইউনিট এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের জন্য বাড়তি হারে মূল্য নির্ধারণ করা হতে পারে।
এর মাধ্যমে একদিকে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের সুরক্ষা দেওয়া হবে, অন্যদিকে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করা হবে।
সরকারের লক্ষ্য বছরে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করা।
লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য স্বস্তি
বিইআরসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত লাইফলাইন সুবিধার আওতায় থাকা গ্রাহকদের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি করা হবে না।
কারণ দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের চাপ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী এমনিতেই চাপে রয়েছে।
ফলে তাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা না চাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
বাজারে নতুন মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে।
বর্তমানে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে কৃষিপণ্য, খাদ্যপণ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে দেখা যাচ্ছে।
এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে। শিল্প-কারখানা, সেচব্যবস্থা, কোল্ড স্টোরেজ, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং সেবা খাতেও এর প্রভাব পড়বে।
ফলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাকেই বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে।
ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকদের উদ্বেগ
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিরোধিতা করেছে।
সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, বিদ্যুতের ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচও বাড়বে। এতে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে ইস্পাত, বস্ত্র, সিরামিক ও উৎপাদন খাত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তাদের মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বর্তমান লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভোক্তাদের আপত্তি
গণশুনানিতে অংশ নেওয়া ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নেতারা বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতের অদক্ষতা, সিস্টেম লস, দুর্নীতি এবং ক্যাপাসিটি চার্জের দায় সাধারণ জনগণের ওপর চাপানো হচ্ছে।
তাদের দাবি, আগে খাতটির সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। অপচয় কমাতে হবে। তারপর মূল্য সমন্বয়ের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।
ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে প্রশ্ন
গণশুনানিতে বিশেষজ্ঞরা ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তাদের মতে, প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হলেও এর প্রয়োজনীয়তা এবং কার্যকারিতা নিয়ে স্বাধীন নিরীক্ষা খুব কমই হয়।
অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে না থেকেও অর্থ পাচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান নিজেও স্বীকার করেছেন, ক্যাপাসিটি চার্জ এখন বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার ঘোষণার পর দেশের অর্থনীতি ও বাজার পরিস্থিতির ওপর এর প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
সরকারের দাবি, বিদ্যুৎ খাতকে আর্থিকভাবে টেকসই করতে মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন। তবে অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের মতে, কেবল দাম বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। দক্ষতা বৃদ্ধি, অপচয় রোধ এবং সুশাসন নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
আজকের ঘোষণার পর স্পষ্ট হবে, দেশের কোটি কোটি গ্রাহককে আগামী দিনগুলোতে বিদ্যুতের জন্য কতটা বাড়তি ব্যয় বহন করতে হবে এবং এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতে কতটা গভীর হবে।
/এস.টি