এস. এ. নয়ন, রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি: প্রবাস জীবনের স্বপ্ন অনেক সময় নির্মম বাস্তবতার কাছে হার মেনে যায়। ওমানে বসবাসরত চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার চার সহোদর ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু সেই বাস্তবতারই এক হৃদয়বিদারক উদাহরণ। কয়েকদিন আগে ওমানের একটি এলাকায় গাড়ির ভেতর থেকে তাদের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে আজ তাদের মরদেহ দেশে ফিরছে।
নিহত চার ভাই হলেন রাশেদুল ইসলাম, সাহেদুল ইসলাম, মোহাম্মদ সিরাজ এবং মোহাম্মদ শহিদ। তারা সবাই চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বাসিন্দা। বহু বছর ধরে তারা ওমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং সেখানেই পরিবার-পরিজনের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন।
জানা গেছে, বিশেষ ব্যবস্থাপনায় তাদের মরদেহ বিমানযোগে ঢাকায় আনা হচ্ছে। রাতের দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এরপর বিশেষ ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহগুলো সরাসরি গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হবে। পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা শেষবারের মতো প্রিয় মানুষগুলোর মুখ দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।
প্রবাসীদের একটি সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, মরদেহ দেশে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। ওমান সরকার এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় দ্রুততার সঙ্গে এসব প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হয়েছে। মরদেহ পরিবহনের ব্যয় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বহন করা হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালের হিমঘর, কাফনের কাপড়, গোসল ও দাফনের প্রস্তুতির মতো অন্যান্য খরচও সংশ্লিষ্ট সংগঠন বহন করেছে। পরিবারকে কোনো ধরনের আর্থিক চাপ নিতে হয়নি।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, গ্রামের বাড়িতে চার ভাইয়ের জন্য পাশাপাশি কবর প্রস্তুত করা হচ্ছে। পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা এখনও এই মৃত্যুর ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, নিহতদের অসুস্থ বৃদ্ধা মাকে এখনো পুরো ঘটনা বিস্তারিতভাবে জানানো হয়নি। পরিবারের সদস্যরা ধীরে ধীরে তাকে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করছেন।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত সপ্তাহে ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় কেনাকাটা শেষে চার ভাই একটি গাড়ির ভেতরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, গাড়ির এসির এক্সজস্ট থেকে নির্গত বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস ধীরে ধীরে গাড়ির ভেতরে জমে যায়। সেই গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তারা মারা যান। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে এটিকে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলেই মনে করছে।
কার্বন মনোক্সাইড অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি গ্যাস, যা গন্ধহীন হওয়ায় অনেক সময় মানুষ টেরই পায় না। বন্ধ জায়গায় গাড়ির এসি চালু রেখে দীর্ঘসময় অবস্থান করলে এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে থাকেন। এই ঘটনা আবারও প্রবাসীদের নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতার গুরুত্ব সামনে নিয়ে এসেছে।
চার ভাইয়ের একসঙ্গে মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো এলাকার মানুষের জন্যও গভীর বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমানো এই মানুষগুলো শেষ পর্যন্ত আর জীবিত অবস্থায় প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরতে পারলেন না। তাদের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের মাতম চলছে।
আজ দেশে ফেরার পর আগামীকাল সকালে গ্রামের বাড়িতে তাদের দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। স্থানীয় মানুষজন, আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা শেষ বিদায় জানাতে সেখানে উপস্থিত থাকবেন। এই মর্মান্তিক ঘটনা প্রবাসজীবনের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার এক করুণ স্মারক হয়ে থাকবে।
/এস.টি