আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনায় আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোর হরমুজ প্রণালী। আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং সামরিক কৌশলের দিক থেকে এই জলপথের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও সামরিক সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালীতে সামুদ্রিক মাইন পেতে বা মাইনের উপস্থিতি ব্যবহার করে কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করছে ইরান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই জলপথকে নিরাপদ রাখতে মাইন অপসারণ এবং নৌ টহল জোরদার করেছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী?
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) প্রতিদিন এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রণালীতে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ, এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
সামুদ্রিক মাইন কী এবং কেন এটি ভয়ঙ্কর?
সামুদ্রিক মাইন হলো পানির নিচে বা নির্দিষ্ট গভীরতায় স্থাপন করা বিস্ফোরক অস্ত্র, যা শত্রু জাহাজ বা নৌযানের গতিবিধি ব্যাহত করার জন্য ব্যবহার করা হয়।
সাধারণত তিন ধরনের মাইন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়
পানির নিচে নোঙর করে রাখা হয়, জাহাজ স্পর্শ করলেই বিস্ফোরিত হতে পারে।
ইনফ্লুয়েন্স মাইন: জাহাজের শব্দ, চাপ বা চৌম্বকীয় পরিবর্তন শনাক্ত করে সক্রিয় হয়।
বটম মাইন: সমুদ্রের তলদেশে স্থাপন করা হয় এবং শনাক্ত করা তুলনামূলক কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে মাইন তুলনামূলক কম খরচে বড় শক্তিধর নৌবাহিনীকেও চাপে ফেলার কার্যকর অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।
কেন চাপে যুক্তরাষ্ট্র?
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনীগুলোর একটি হলেও সামুদ্রিক মাইন অপসারণ অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ। একটি মাইন শনাক্ত, যাচাই এবং নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করতে বিশেষ প্রযুক্তি, ডুবুরি ইউনিট, ড্রোন এবং মাইন-সুইপার জাহাজের প্রয়োজন হয়।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালীতে মাইন অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে এবং নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
এদিকে বিভিন্ন মার্কিন ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য মাইন হুমকির কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কিছু জাহাজ বিকল্প রুট ব্যবহার করছে, আবার কিছু জাহাজ বিশেষ নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলাচল করছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে মাইন ইস্যু
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক দফায় প্রকাশ্যে ইরানকে সতর্ক করেছেন। তিনি দাবি করেন, যদি হরমুজ প্রণালীতে মাইন স্থাপন করা হয়ে থাকে, তবে তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। অন্যথায় এর সামরিক পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বেশি আলোচনায় আসে। কারণ, এতে স্পষ্ট হয় যে ওয়াশিংটন মাইন হুমকিকে কেবল সামরিক নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেও দেখছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে কী প্রভাব পড়ছে?
হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা সংকটের কারণে
জাহাজের বীমা খরচ বেড়েছে।
জ্বালানি পরিবহনের সময় বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
অনেক শিপিং কোম্পানি ঝুঁকি মূল্যায়ন পুনর্বিবেচনা করছে।
কিছু প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপত্তার কারণে তাদের স্বাভাবিক ট্র্যাকিং সিস্টেম সীমিত ব্যবহার করছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে।
ইরানের কৌশলগত সুবিধা কোথায়?
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থান। সরাসরি বড় নৌযুদ্ধের পরিবর্তে ছোট নৌযান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামুদ্রিক মাইন ব্যবহার করে তারা তুলনামূলক কম ব্যয়ে বড় শক্তিকে চাপে রাখতে পারে।
এই কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ মাইনকে “অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার” বা অসম যুদ্ধ কৌশলের অন্যতম কার্যকর অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করেন।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় মিত্র দেশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপরিবহন সংস্থাগুলো হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পদক্ষেপ নিচ্ছে। অন্যদিকে ইরানও এই জলপথকে তার কৌশলগত প্রভাবের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব বিবেচনায় অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এখানে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক নয়। তবে সামুদ্রিক মাইন ইস্যু যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই।
/এস.টি