G-VV5KW25M6F
Take a fresh look at your lifestyle.

বিএসইসিতে নতুন নেতৃত্ব পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ

0

নিজস্ব সংবাদ : বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্ব পেয়েছে। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন করপোরেট জগতের পরিচিত মুখ ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করা মাসুদ খান। তাঁর নেতৃত্বে নতুন কমিশনের যাত্রা শুরু হলেও সামনে রয়েছে কঠিন সব চ্যালেঞ্জ।

বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে আস্থাহীনতায় ভোগা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই উন্নয়নের পথ তৈরি করাই হবে নতুন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নানা সংকট, অনিয়ম, কারসাজি ও নীতিগত দুর্বলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০১০ সালের ভয়াবহ শেয়ারবাজার ধসের পর লাখো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।

সেই ধসের ক্ষত এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাজার। এরপর একাধিকবার বিএসইসির নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাজারে স্থিতিশীলতা ও আস্থা ফিরে আসেনি।
২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিএসইসির চেয়ারম্যান ছিলেন এম খাইরুল হোসেন। তাঁর সময়কালে বাজার পুনর্গঠনের নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়।

অনেক দুর্বল ও মৌলভিত্তিহীন কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ পায় বলে অভিযোগ ওঠে। এতে আইপিও বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমতে থাকে।
পরবর্তীতে শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বে কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাঁর সময়ে বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়লেও একই সঙ্গে শেয়ার কারসাজি, কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক লেনদেনের অভিযোগও বাড়তে থাকে। বাজারের একটি অংশ কারসাজিকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অনেক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও হতাশা সৃষ্টি হয়।

এরপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্বে আসেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। তাঁর সময়ে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ সামনে না এলেও বাজারে প্রত্যাশিত গতি ফিরে আসেনি। বিএসইসির অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমেও কিছুটা স্থবিরতা দেখা দেয়। এমনকি সংস্থাটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের কর্মীদের অসন্তোষের মুখে পড়তে হয়। এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাবমূর্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মাসুদ খানের দায়িত্ব গ্রহণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাঁর লক্ষ্য হবে প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ এবং কার্যকর একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা। তিনি মনে করেন, বাজারে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যেমন সমস্যা সৃষ্টি করে, তেমনি প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণের অভাবও অনিয়ম বাড়ায়। তাই কোথায় কঠোরতা প্রয়োজন এবং কোথায় সহজীকরণ দরকার, সে বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করবে নতুন কমিশন।

বর্তমানে পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট। অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী অতীতে বড় ক্ষতির শিকার হয়ে বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। নতুন বিনিয়োগকারীরাও বাজারে আসতে দ্বিধা বোধ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু বক্তব্য নয়, বাস্তব পদক্ষেপের প্রয়োজন হবে। বাজারে কারসাজি বন্ধ করা, অনিয়মকারীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত করা জরুরি।

ভালো কোম্পানির অভাবও দেশের পুঁজিবাজারের একটি বড় সমস্যা। দেশের অনেক বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান এখনো শেয়ারবাজারে আসেনি। ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য মানসম্পন্ন শেয়ারের সংখ্যা সীমিত। নতুন কমিশন যদি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনতে পারে, তাহলে বাজারের গভীরতা ও স্থিতিশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও নতুন কমিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং নীতিগত স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেন। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক মানের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, তথ্য প্রকাশের স্বচ্ছতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

মিউচুয়াল ফান্ড খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। একসময় বিনিয়োগকারীদের কাছে জনপ্রিয় এই খাত বর্তমানে নানা সংকটে জর্জরিত। অনেক ফান্ড দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত সম্পদমূল্যের নিচে লেনদেন হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে। নতুন কমিশনের উচিত এ খাতকে পুনর্গঠন এবং কার্যকর তদারকির আওতায় আনা।
প্রযুক্তিনির্ভর বাজার গঠনও সময়ের দাবি। বর্তমানে বিশ্বের উন্নত পুঁজিবাজারগুলোতে ডিজিটাল নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে।

মাসুদ খান ইতোমধ্যে বিএসইসিকে আরও ডিজিটাল ও প্রযুক্তিনির্ভর করার কথা বলেছেন। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে বাজারে অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন চেয়ারম্যান স্পষ্ট করেছেন যে, শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো নীতিতে তারা বিশ্বাসী নন। বরং বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ নিশ্চিত করতে চান। এটি একটি ইতিবাচক বার্তা, কারণ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কৃত্রিম ব্যবস্থার কারণে বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিএসইসির নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং পেশাদার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছাড়া একটি সুস্থ ও কার্যকর পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নানসহ বাজারসংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাজারের ইকোসিস্টেম পুনর্গঠন করা। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হবে, বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বোধ করবেন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহ পাবেন।

সব মিলিয়ে বিএসইসির নতুন নেতৃত্বের সামনে সুযোগ যেমন বড়, তেমনি চ্যালেঞ্জও বিশাল। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, কারসাজিমুক্ত বাজার গঠন, ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তি, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা চালু এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলেই নতুন কমিশন সফল হিসেবে বিবেচিত হবে। দেশের অর্থনীতির বিকাশে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর পুঁজিবাজার অপরিহার্য। তাই এখন বিনিয়োগকারী, বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সরকারের প্রত্যাশা—নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে দেশের পুঁজিবাজার নতুন এক যুগে প্রবেশ করবে এবং হারানো আস্থা ফিরে পাবে।
/এস.টি

Leave A Reply

Your email address will not be published.