আসুন বিগত বছরের হিসাব মেলাই, নতুন বছরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করি
আব্দুল মালেক মু. ইবনে দিনার নাজাত
হিজরি ১৪৪৮
আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের জীবনে আরেকটি নতুন হিজরি বছর উপস্থিত হয়েছে। বিদায় নিয়েছে ১৪৪৭ হিজরি, শুরু হয়েছে ১৪৪৮ হিজরি। একটি বছর চলে যাওয়া কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তন নয়; এটি আমাদের জীবন থেকে একটি মূল্যবান সময়ের বিদায়। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ প্রতিদিন, প্রতি মাস এবং প্রতি বছর নিজের জীবনের পুঁজি ব্যয় করছে। সেই পুঁজির নাম সময়।
নতুন বছরের শুরুতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বিগত বছরে আমরা কী অর্জন করেছি? আমাদের ঈমান কি বেড়েছে? আমাদের আমল কি উন্নত হয়েছে? আমরা কি আল্লাহর আরও নিকটবর্তী হতে পেরেছি, নাকি দুনিয়ার ব্যস্ততায় আরও দূরে সরে গেছি?
হিজরি নববর্ষ একজন মুমিনের জন্য শুধু শুভেচ্ছা বিনিময়ের উপলক্ষ নয়; এটি আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
হিজরি সন: শুধু আরবদের নয়, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর পরিচয়
অনেকেই ভুলভাবে মনে করেন হিজরি সন কেবল আরব বিশ্বের বিষয়। বাস্তবতা হলো, হিজরি সন সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সন। এটি ইসলামী ইতিহাস, ইবাদত ও ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
রোজা, হজ, যাকাত, আশুরা, শবে বরাত, শবে কদরসহ ইসলামের বহু গুরুত্বপূর্ণ আমল ও ইবাদত চন্দ্র মাসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। তাই হিজরি ক্যালেন্ডার মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হিজরি নববর্ষ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হিজরতের মহান ঘটনা, যা ইসলামী সভ্যতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।
মুহাসাবা: একজন মুমিনের অপরিহার্য গুণ
ইসলামে আত্মসমালোচনার নাম মুহাসাবা। অর্থাৎ নিজের কাজ, কথা, আচরণ ও উদ্দেশ্যকে যাচাই করা।
আমরা ব্যবসা করলে লাভ-ক্ষতির হিসাব করি। চাকরি করলে আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখি। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাব—আখিরাতের হিসাব—কতটুকু করি?
একজন সচেতন মুমিন নিয়মিত নিজের কাছে প্রশ্ন করে:
আমি কি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিকমতো আদায় করেছি?
কুরআনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কেমন ছিল?
আমি কি গুনাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা করেছি?
আমার চরিত্র কি আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে?
আমি কি মানুষের হক আদায় করেছি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আমাদের প্রকৃত অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে।
ঈমান ও আমলের হিসাব
একটি বছর শেষ হওয়ার পর প্রথম যে বিষয়ে চিন্তা করা উচিত তা হলো ঈমান ও আমল।
আমাদের ঈমান কি আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে? আল্লাহর প্রতি ভয়, ভালোবাসা ও ভরসা কি বৃদ্ধি পেয়েছে?
নামাজের ক্ষেত্রে আমরা কতটা নিয়মিত ছিলাম? কুরআন তিলাওয়াত কি দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে? ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি সুন্নাহ ও নফল আমলে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে?
যদি ঘাটতি থেকে থাকে, তাহলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। যতদিন জীবন আছে, ততদিন সংশোধনের সুযোগ আছে। আল্লাহ তাআলার রহমত অসীম।
মা-বাবা ও পরিবারের প্রতি দায়িত্ব
অনেক সময় আমরা ধর্মীয় আমলের দিকে নজর দিলেও পারিবারিক দায়িত্বের হিসাব করতে ভুলে যাই।
মা-বাবার প্রতি সম্মান, সেবা ও আনুগত্য ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। গত এক বছরে আমরা কি তাদের যথাযথ সময় দিয়েছি?
স্ত্রী, সন্তান এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি আমাদের আচরণ কেমন ছিল? আমরা কি তাদের জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করতে পেরেছি?
পরিবারের দ্বীনি শিক্ষা, নৈতিকতা এবং ইসলামী পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য আমরা কী করেছি?
নতুন বছরের শুরুতে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
কর্মক্ষেত্রে আমানতদারিতা
ইসলাম শুধু মসজিদে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে।
চাকরি, ব্যবসা কিংবা যেকোনো পেশায় আমরা কি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি?
সময়মতো দায়িত্ব পালন করেছি কি?
কারও হক নষ্ট করেছি কি?
প্রতারণা বা অসততা করেছি কি?
হালাল উপার্জনের প্রতি যত্নশীল ছিলাম কি?
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।
অতএব, কর্মজীবনের হিসাবও একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমাজ ও উম্মাহর প্রতি দায়িত্ব
একজন মুসলমান কখনো শুধু নিজের জন্য বাঁচে না। তার দায়িত্ব পরিবার ছাড়িয়ে সমাজ ও উম্মাহ পর্যন্ত বিস্তৃত।
আমরা কি অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছি?
মজলুম মানুষের জন্য কি দোয়া করেছি?
সমাজের অন্যায়, দুর্নীতি, মিথ্যা ও অবিচারের বিরুদ্ধে অন্তত অন্তরে ঘৃণা পোষণ করেছি?
মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ, সহযোগিতা ও মানবিক দায়িত্ববোধের ক্ষেত্রেও আমাদের নিজেদের মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সময়: মানুষের সবচেয়ে বড় পুঁজি
মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ অর্থ নয়, সময়।
যে সময় চলে যায়, তা আর কখনো ফিরে আসে না।
একটি বছর মানে ৩৬৫ দিন। প্রতিটি দিন আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত। প্রশ্ন হলো, আমরা এই আমানত কীভাবে ব্যবহার করেছি?
আমরা কি সময়কে ইবাদত, শিক্ষা, পরিবার ও কল্যাণকর কাজে ব্যয় করেছি?
নাকি অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দুনিয়াবি বিভ্রান্তিতে নষ্ট করেছি?
হিজরি নববর্ষ সময়ের মূল্য উপলব্ধি করার একটি বিশেষ উপলক্ষ।
আখলাক ও চরিত্র গঠনের প্রয়োজন
ইসলামে সুন্দর চরিত্রের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কিয়ামতের দিন মুমিনের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী হবে উত্তম চরিত্র।
গত এক বছরে আমাদের রাগ, অহংকার, হিংসা, গীবত, কৃপণতা ও আত্মপ্রশংসা কতটুকু কমেছে?
আমরা কি ক্ষমাশীল হতে শিখেছি?
মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে কি নম্রতা ও সৌজন্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে?
চরিত্র উন্নয়ন ছাড়া প্রকৃত সফলতা অর্জন সম্ভব নয়।
নতুন বছরের জন্য করণীয়
হিজরি ১৪৪৮-এর শুরুতে কিছু বাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে—
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে নিয়মিত হওয়া
নামাজই ঈমানের ভিত্তি। এটিকে জীবনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত
অল্প হলেও নিয়মিত কুরআন পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
গুনাহ থেকে তওবা
বিগত বছরের ভুলগুলো স্বীকার করে আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা করতে হবে।
পরিবারকে সময় দেওয়া
পরিবারের সঙ্গে ইসলামী পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে।
নতুন দ্বীনি জ্ঞান অর্জন
প্রতি সপ্তাহে অন্তত কিছু সময় ইসলামী জ্ঞান অর্জনের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত।
নতুন বছরের দোয়া
রাসূলুল্লাহ ﷺ নতুন চাঁদ দেখে দোয়া করতেন—
“আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল-আমনি ওয়াল-ঈমান, ওয়াস-সালামাতি ওয়াল-ইসলাম।”
অর্থ: “হে আল্লাহ! এই চাঁদকে আমাদের উপর উদিত করুন নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে।”
এই দোয়ার মধ্যেই একজন মুমিনের পুরো জীবনের লক্ষ্য নিহিত রয়েছে।
১৪৪৭ হিজরি চলে গেছে। সেই বছরের আমলনামা আর পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। কিন্তু ১৪৪৮ হিজরি এখনো আমাদের সামনে উন্মুক্ত।
আসুন, আমরা নিজেদের দিকে ফিরে তাকাই। আত্মসমালোচনা করি। ভুল থেকে শিক্ষা নিই। গুনাহ থেকে তওবা করি। ঈমান ও আমলে উন্নতির পরিকল্পনা করি।
হিজরি নববর্ষ শুধু নতুন বছরের সূচনা নয়; এটি নতুন জীবন শুরু করারও একটি সুযোগ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের বিগত বছরের সকল গুনাহ ক্ষমা করুন, আমাদের ঈমানকে মজবুত করুন, আমলকে কবুল করুন এবং হিজরি ১৪৪৮-কে আমাদের জন্য কল্যাণ, বরকত, শান্তি ও নাজাতের বছর হিসেবে কবুল করুন। আমীন।