সংবিধান সংশোধন নয়, পুরো পরিবর্তন চান শফিকুর রহমান!
সংবিধান সংশোধন নয়, পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের দাবি বিরোধী দলের; বিশেষ কমিটি গঠনের আহ্বান
অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি। বিদ্যমান সংবিধানে সীমিত সংশোধনের পরিবর্তে সামগ্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল। তাদের দাবি, সংবিধান নিয়ে খণ্ডিত পরিবর্তনের পরিবর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন, যাতে দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো আরও কার্যকর ও জনমুখী হয়।
জাতীয় সংসদের এলডি হলে সংসদ বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বিরোধীদলীয় নেতা ও ডা. শফিকুর রহমান এ অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, সংবিধান সংস্কারকে গুরুত্ব দিয়ে একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করা হলে বিরোধী দল গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত রয়েছে।
সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধী দলের অবস্থান
বিরোধী দলের মতে, কেবল কয়েকটি ধারা পরিবর্তন করে দেশের সাংবিধানিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং একটি সুসংগঠিত ও বিস্তৃত সংস্কার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটানো প্রয়োজন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার যদি সংবিধান সংস্কার কমিটির সুনির্দিষ্ট ও লিখিত প্রস্তাব সংসদের সামনে উপস্থাপন করে, তাহলে বিরোধী দল সেই আলোচনায় অংশ নেবে। তবে কোনো অস্পষ্ট বা সীমিত উদ্যোগে তারা অংশ নিতে আগ্রহী নয়। আরও পড়ুন: খুনিরা শনাক্ত,তবুও মামলা নেই,আটকও নয় কেউ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে, কারণ সংবিধান সংস্কার দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম প্রধান বিষয়।
আরও পড়ুন:ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার জিসানকে নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন
জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের দাবি
সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেতা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের বিষয়টিও জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংসদের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন না হলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ অনুসরণ করা হবে।
তার ভাষায়, বিরোধী দল অযৌক্তিক সংঘাত কিংবা অন্ধ সমর্থনের পথে হাঁটবে না। জনগণ এমন একটি বিরোধী দল দেখতে পাবে, যারা প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারকে সমর্থনও করবে, আবার সমালোচনাও করবে।
এই বক্তব্যকে অনেকেই বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে একটি নতুন অবস্থান হিসেবে দেখছেন।
সংসদে যেসব বিষয় তুলে ধরেছে বিরোধী দল
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংসদে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন
ব্যাংকিং খাতের সংকট
প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা
সীমান্তে পুশ-ইন ইস্যু
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও বাজেট বাস্তবায়ন
ডা. শফিকুর রহমান জানান, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সমস্যার সমাধানে একটি সংসদীয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
বাজেট ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা
সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
তার অভিযোগ, সম্পূরক বাজেট নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা বিপুল অঙ্কের সরকারি ব্যয়ের সুযোগ তৈরি করছে। তিনি মনে করেন, অর্থবছরের একেবারে শেষ দিকে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের কারণে অপচয়, অনিয়ম এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
এছাড়া তিনি প্রস্তাব করেন যে, দেশের অর্থবছর জুন-জুলাইয়ের পরিবর্তে ডিসেম্বর-জানুয়ারি ভিত্তিক করা হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশও দীর্ঘদিন ধরে অর্থবছরের সময়সূচি পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা করে আসছেন।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
সংবাদ সম্মেলনে সীমান্ত পরিস্থিতিও গুরুত্ব পায়।
বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, সীমান্তে পুশ-ইন বা জোরপূর্বক লোকজন পাঠিয়ে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হলেও সংসদে এ সংক্রান্ত নোটিশ নিয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি দাবি করেন, একপর্যায়ে বিষয়টি সংসদের কার্যসূচি থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো যথাযথ আলোচনার সুযোগ পাচ্ছে না।
কেমন বিরোধী দল হতে চায় জামায়াত?
ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্টভাবে জানান, অতীতের মতো সরকারনির্ভর বা শুধুমাত্র সংঘাতমুখী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চায় না তার দল।
তিনি বলেন, সংসদে অকারণ প্রশংসা, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা সময় নষ্ট করার রাজনীতিতে তারা বিশ্বাসী নন। বরং জনগণের পক্ষে যুক্তিনির্ভর বক্তব্য তুলে ধরাই হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য।
তার ভাষায়, জনস্বার্থে সরকারের ভালো সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা হবে এবং ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হবে।
এছাড়া প্রয়োজন হলে ওয়াকআউটের মতো সংসদীয় কৌশল ব্যবহার করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি সংসদ বর্জনের পথে না যাওয়ার ইঙ্গিত দেন তিনি।
রাজনৈতিক গুরুত্ব কতটা?
পর্যবেক্ষকদের মতে, সংবিধান সংস্কার, বাজেট ব্যবস্থাপনা, প্রবাসী কল্যাণ এবং সীমান্ত ইস্যু—সবগুলো বিষয়ই আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধী দলের বিশেষ কমিটির দাবি সংসদে নতুন বিতর্ক ও আলোচনা তৈরি করতে পারে। সরকার এ বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেটিই এখন রাজনৈতিক মহলের প্রধান আগ্রহের বিষয়।
সংবিধানের আংশিক সংশোধনের পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের দাবি জানিয়ে বিরোধী দল একটি নতুন রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এখন দেখার বিষয়, সরকার সংবিধান সংস্কার বিষয়ে কোনো বিশেষ কমিটি গঠন করে কি না এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কতটা কার্যকর সংলাপ গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সংসদীয় রাজনীতির ভবিষ্যতের জন্য এই আলোচনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সিতাজ/এস.টি