নিজস্ব সংবাদ: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অপরাধ, ভূমিদস্যুতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এবার এলাকাটি নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, জঙ্গল সলিমপুরকে কোনোভাবেই অপরাধী চক্র বা সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হতে দেওয়া হবে না।
রোববার এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রবিরোধী যেকোনো অপতৎপরতা কঠোরভাবে দমন করা।
দীর্ঘদিনের সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু
জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে পরিচিত। পাহাড়ি ও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠী এখানে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কিছু এলাকায় প্রশাসনের উপস্থিতি সীমিত থাকায় সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অতীতে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিছু অসাধু গোষ্ঠী এই এলাকায় নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।
যৌথ অভিযানে পরিবর্তনের সূচনা
সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা, চাঁদাবাজি এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করে।
মন্ত্রী বলেন, যৌথ অভিযানের ফলে সন্ত্রাসী চক্রের অনেক কার্যক্রম ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। অপরাধীদের গড়ে তোলা বিভিন্ন নজরদারি ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রণ কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে তথ্য ফাঁস হওয়ায় মূল অভিযানের লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বার্তা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে কেউ সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে না। যারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, অতীতে সংঘটিত কিছু দুঃসাহসিক ঘটনার পেছনে কারা জড়িত ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ভূমি দখল, সন্ত্রাসী অর্থায়ন এবং অপরাধী চক্রের নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য আশ্বাস
পরিদর্শনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগের বিষয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, যারা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বসবাস করছেন এবং জীবিকার প্রয়োজনে এখানে বসতি গড়েছেন, তাদের স্বার্থ বিবেচনায় রেখে সরকার কাজ করবে।
তার ভাষায়, প্রকৃত বাসিন্দাদের হয়রানি করা সরকারের উদ্দেশ্য নয়। বরং আইনগত ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের জন্য টেকসই সমাধান ও পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নেওয়া হবে।
এলাকার মানুষকে গুজব বা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেন।
উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা
শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, জঙ্গল সলিমপুরের উন্নয়নেও বড় ধরনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। মন্ত্রী বলেন, এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণও সহজ হবে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সঙ্গে জঙ্গল সলিমপুরের সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধুনিক সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুললে এলাকার মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা আরও সহজে পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।0
নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ
সরকারি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি আরও জোরদার করা। ভবিষ্যতে পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ড্রোন প্রযুক্তি ও আধুনিক জরিপ ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো এলাকার ভৌগোলিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এর ভিত্তিতে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
অপরাধমুক্ত অঞ্চল গঠনের প্রত্যয়
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, জঙ্গল সলিমপুরকে কেন্দ্র করে যেসব অপরাধী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। একইসঙ্গে আশপাশের অন্যান্য অপরাধপ্রবণ এলাকাতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হবে।
তার মতে, নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং জনগণের আস্থা—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলেই জঙ্গল সলিমপুরকে একটি শান্তিপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় অঞ্চলে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
সরকারের লক্ষ্য কেবল অপরাধ দমন নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে সাধারণ মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারবে, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারবে এবং উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারবে। জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে ঘোষিত নতুন পরিকল্পনা সেই লক্ষ্য পূরণেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
/এস.টি