১০ মাস পর দেশে ফিরেই রাজনৈতিক চমক মাচাদোর, ভেনেজুয়েলায় জনতার ঢল!
চাটগাঁর তাজ ডেস্ক | আন্তর্জাতিক
প্রায় ১০ মাস নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর আকস্মিকভাবে নিজ দেশ ভেনেজুয়েলায় ফিরেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার সমর্থকের উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) দেশে ফিরে সমর্থকদের উদ্দেশে নিজের উপস্থিতির ঘোষণা দেন ৫৯ বছর বয়সী এই নেত্রী। বার্তা সংস্থা এএফপি ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
মাচাদোকে স্বাগত জানাতে রাজপথে জনতার ঢল
দীর্ঘদিন পর মাচাদোর দেশে ফেরার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন এলাকায় সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে আসেন।
দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর বারকিসিমেতো থেকে রাজধানী কারাকাসের পথে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে যাত্রা করেন তিনি। এ সময় মহাসড়ক, টোল প্লাজা ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে জাতীয় পতাকা হাতে ভিড় করেন হাজার হাজার মানুষ।
গুয়াকারা শহরের একটি জনাকীর্ণ চত্বরে সমর্থকদের সঙ্গে জাতীয় সংগীতে কণ্ঠ মেলান মাচাদো। তাঁকে স্বাগত জানিয়ে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে স্লোগান দেন উপস্থিত জনতা।
পরে রাজধানী কারাকাসে পৌঁছানোর সময়ও তাঁকে ঘিরে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়। গাড়ির ছাদ দিয়ে উঠে সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নাড়েন এবং তাঁদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এই বিরোধী নেত্রী।
সাতবার ব্যর্থ চেষ্টার পর অবশেষে দেশে ফেরা
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণের উদ্দেশ্যে গোপনে ভেনেজুয়েলা ছাড়েন মারিয়া কোরিনা মাচাদো। এর আগে দেশের ভেতরেই প্রায় এক বছর আত্মগোপনে ছিলেন তিনি।
দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, নির্বাসিত অবস্থায় অন্তত সাতবার দেশে ফেরার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি মাচাদো।
অবশেষে রোববার বারকিসিমেতোর সান্তা রোসা গির্জায় প্রকাশ্যে দেখা যায় তাঁকে। সেখানে সমর্থকেরা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে তাঁকে স্বাগত জানান।
মাচাদোর দেশে প্রবেশের পথ নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। দুই ভেনেজুয়েলান নির্বাসিত নাগরিকের বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, তিনি প্রতিবেশী কলম্বিয়া হয়ে দেশে ফিরেছেন। তবে কলম্বিয়ার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।
মাদুরো পরবর্তী ভেনেজুয়েলায় নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
মাচাদোর প্রত্যাবর্তন এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন চলছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়।
এরপর মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
তবে মাচাদো ও তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল, মাদুরোর পতনের পর দ্রুত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পথ তৈরি হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেনি।
রাজনৈতিক আলোচনায় জায়গা পাননি মাচাদো
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিরোধী পক্ষের একটি অংশের মধ্যে আলোচনা চলছে।
কিন্তু দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী বিরোধী নেত্রী হওয়া সত্ত্বেও এসব আলোচনায় মাচাদোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এ পরিস্থিতিতে তাঁর প্রত্যাবর্তন অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ মাচাদোর দেশে ফেরার সুযোগ এবং দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
মাচাদোর প্রত্যাবর্তনে যা বললেন ট্রাম্প
মারিয়া কোরিনা মাচাদোর দেশে ফেরার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, এ বিষয়ে তিনি আগে থেকে কিছু জানতেন না।
তবে মাচাদোকে একজন ভালো নারী হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি এবং নোবেল পদক উপহার দেওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়েও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প।
ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণকে ওয়াশিংটন গুরুত্ব দিচ্ছে।
মাচাদোর প্রত্যাবর্তন নিয়ে মার্কো রুবিওর বক্তব্য
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ওয়াশিংটনের সমর্থনে চলমান রাজনৈতিক আলোচনার ফলেই মাচাদোর নিরাপদে ভেনেজুয়েলায় ফেরা সম্ভব হয়েছে।
তিনি দেশটির রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে আলোচনায় সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা যায়।
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন পথে?
মাচাদোর দেশে ফেরা ভেনেজুয়েলার চলমান রাজনৈতিক সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পথে এগোতে চাইছে। অন্যদিকে মাচাদোর সমর্থকেরা দ্রুত জাতীয় নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি তুলছেন।
দীর্ঘ নির্বাসন শেষে বিরোধী নেত্রীর এমন প্রত্যাবর্তন আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনায় তাঁর অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে কি না, তা নির্ভর করবে সরকার, বিরোধী দল ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
সূত্র: এএফপি, রয়টার্স।
![]()



